# গল্প_হলেও_সত্যি
------------------------------
# সায়ন্তনী
কলেজের বিশাল বিল্ডিঙের সামনে দিশাহারা হয়ে দাঁড়িয়েছিল নীল মানে নীলাভ্র । মফঃস্বল শহর পুরুলিয়া থেকে কলকাতার এই বিশাল কলেজে ভর্তি হয়েছে নীল ফিজিক্স নিয়ে পড়বে বলে । ছোট্ট শহরে সব ছোট ছোট দেখে অভ্যস্ত নীল এই বিশাল জায়গায় এসে একটু ঘাবড়ে গেছে । মা বাবা সাহস দিয়েছেন , বলেছেন কদিন গেলেই নীল সব কিছুর সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে । এখানে নীলের কোনো বন্ধু নেই , কোনো পরিচিত কেউও নেই । ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট কোনদিকে কে জানে ! খুঁজে বের করতে হবে । এগিয়ে গেল নীল ।
" এই যে দাদা ! ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টটা কোনদিকে , একটু বলে দেবেন প্লিজ ? "
যাকে বলা হল , সেই দাদাটি আরও দু তিনজনের সাথে আড্ডায় ব্যস্ত ছিল , প্রশ্ন শুনে ফিরল , তারপর নীলকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালো করে জরিপ করে নিয়ে বলল , " নতুন ব্যাচ বুঝি ? নিশ্চয়ই গ্রাম থেকে আসা হয়েছে ? তা এখানে টিকতে পারবে তো বাবু ? " অবাক নীল কিছু জবাব দিল না । আরেকজন এগিয়ে এল , " এরকম পাট পাট করে চুল আঁচড়ালে তোকে কলেজে ঢুকতে দেবো না রে গাঁইয়া , দেখি চুলটা ঠিক করে আঁচড়ে দিই ! "
বলেই সে পকেট থেকে চিরুনি বের করে নীলের চুল আঁচড়াতে গেল , নীল যত বাধা দেয় , ওরা তত হাসে , নীল বুঝতেই পারছিল না , ওরা এমন করছে কেন ? কি আনন্দ পাচ্ছে !
ওদের আক্রমণ বা রাগিং এ নীল যখন দিশাহারা , তখনি শুনতে পেল কেউ বলছে , " আরে ! অবিনাশ দা ! কেন এরকম করছ বেচারার সাথে ? ছেড়ে দাও ! দেখছ না ঘাবড়ে গেছে ! " নীল তাকিয়ে দেখল গোলাপি সাদা ড্রেসে এক অপরূপা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে কথাগুলো বলছে ।
+ আরে কিছু না , একটু মজা করছিলাম রে , গেঁয়ো টাকে শহুরে বানাতে হবে তো ! তোরই ডিপার্টমেন্টের রে পাপড়ি । "
" ছেড়ে দাও ওকে , তোমাদের আর ওকে নিয়ে মাথা ব্যথা না করলেও চলবে।"
বলল পাপড়ি নামের অপরূপা ।
নীল হাঁ করে মেয়েটিকে দেখছিল , এত সুন্দর কেউ হয় ! আর কি সাহস ! কি তেড়ে ঝগড়া করছে ! মেয়েটি তখন নীলকে বলল , " তুমি ফিজিক্স এর ? সাত দিন হয়ে গেছে ক্লাস , কোথায় , তোমায় তো দেখি নি ! "
" আমি অনেক দূরে থাকি । সব ঠিকঠাক করে এখানে ক্লাসে জয়েন করতে তাই একটু দেরী হয়ে গেছে । কোনদিকে আমাদের ক্লাস ? "
" তুমি চলো আমার সাথে । একসাথে যাবো । " বলল পাপড়ি ।
যেতে যেতে নীল বলল , " ওই দাদাটা কে ? এমন করছিল কেন ? "
" আরে এ অবিনাশ দা । আমাদের পাড়ার , ভালো করে চিনি , সারাদিন শুধু শয়তানি করে বেড়ায় , কেমিস্ট্রি সেকেন্ড ইয়ার , ফার্স্ট ইয়ার কোনোমতে পার করেছে , সেকেন্ড ইয়ারটা কি করবে কে জানে ! বইপত্রের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই তো ! " বলল পাপড়ি ।
" তোমার খুব সাহস " বলেই ফেলল নীল , পাপড়ি হাসল শুধু ।
এরপর থেকে নীল আর পাপড়ির দারুণ বন্ধুত্ব হয়ে গেল । এতদিনে নীল নিজেকে অনেকটা মানিয়ে নিয়েছে এই শহরের সাথে । শহরটাকে অনেকটা ভালোবেসেও ফেলেছে । কত কি আছে এখানে , ওদের গ্রাম্য শহরে তো কিছুই নেই ।
নীল একটা বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হয়ে থাকছে , হোস্টেলের পরিবেশে ছেলে মানিয়ে নিতে পারবে কি না সেই চিন্তায় নীলের মা বাবা ছেলেকে ঘরোয়া পরিবেশে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন । ভালোই লাগছে সেখানে নীলের ।
পাপড়ির বাড়ি লেক টাউনে , ওর মা বাবা দুজনেই চাকরি করেন , বলেছে পাপড়ি । অনেক কথা হয় ওদের দুজনের , হবে নাই বা কেন ! সারাক্ষণ প্রায় একসাথে থাকে যে ! যেখানে নীল সেখানেই পাপড়ি বা যেখানেই পাপড়ি সেখানেই নীল । পাপড়ির কাছে নীল শুধুই ওর প্রিয় বন্ধু , জানে নীল , কিন্তু নীল যে পাপড়িকে ভালোবেসে ফেলেছে , একেবারে পাগলের মত ভালোবেসে ফেলেছে , কি করবে নীল ?পাপড়িকে বলতেও ভয় লাগে , হয়তো হেসেই উড়িয়ে দেবে বা ওদের বন্ধুত্বটাই নষ্ট হয়ে যেতে পারে । তাই মনের কথা মনেই চেপে রাখে নীল ।
আজ ক্লাসের পর নীল আর পাপড়ি একটু বেরোচ্ছিল , একটু কলেজ স্ট্রীট যাবে । কিছু বই কিনতে হবে । তখনই অবিনাশ এসে ওদের পথ আটকে দাঁড়ালো , " কোথায় যাচ্ছিস পাপড়ি ? এই গেঁয়ো ভূতটার সাথে তোর এত মাখামাখি কিসের?"
" নিজের মুখের ভাষা আগে ঠিক কর অবিনাশ দা । নীল আমার বন্ধু , আর গেঁয়ো হোক আর যাই হোক , তোমাদের থেকে হাজার গুণে ভালো ছেলে । "
" ওহ ! খুব ভালো লাগছে এই ছেলেকে তোর , তাই না ? " চিবিয়ে চিবিয়ে বলল অবিনাশ ।
" হ্যাঁ ভালো লাগছে , তাতে তোমার কি ? এখন পথ ছাড়ো , বেরবো "
হঠাত অবিনাশ নীলকে চমকে দিয়ে পাপড়ির হাত চেপে ধরল , " খুব বেড়ে গেছিস তুই , তাই না ? বেশী বাড় ভালো নয় কিন্তু ! "
এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে পাপড়ি বলল , " কার বাড় বেড়েছে , সে তো দেখাই যাচ্ছে , আমি কার সাথে মিশি , না মিশি , তা নিয়ে তোমার কিসের মাথা ব্যথা ! "
নীলের হাত ধরে টেনে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলো পাপড়ি , পেছন থেকে অবিনাশ বলল , " এর ফল কিন্তু ভালো হবে না , পস্তাতে হবে তোকে । "
রাস্তায় বেরিয়ে নীল বলল , " অবিনাশ দা কি তোকে পছন্দ করে ? তাই আমার সঙ্গে মিশতে বারণ করছে ? "
" ছাড় তো অবিনাশ দার কথা , ওর আবার পছন্দ আর অপছন্দ । আজ পর্যন্ত কত মেয়ের সঙ্গে ও জড়িয়েছে , তার ঠিক নেই , খুব বাজে ছেলে । কত বড় সাহস যে আমাকে এভাবে বলতে এসেছে , আমি কি ওর কেনা সম্পত্তি নাকি ? "
" ভয় করছে না তোর ? " বলল নীল ।
" অন্যায়ের সঙ্গে লড়তে গেলে কি ভয় করলে চলে ? " হেসে বলল পাপড়ি ।
এর পর থেকে কলেজে নীলের জিনা হারাম করে দিল অবিনাশ আর তার সাঙ্গোপাঙ্গরা । দেখলেই পেছনে লাগে , আজেবাজে কথা বলে , অশান্তির ভয়ে নীল সব সহ্য করে ।
আজ আবার পাপড়ি আর নীল বেরচ্ছিল , উদ্দেশ্য ওই সামনের বিশুদার দোকান থেকে একটু লস্যি খেয়ে আসবে । কি দারুণ বানায় , এই গরমে খুব ভালো লাগবে।
পথ আটকালো অবিনাশ ওরা , " কি মিয়াঁ বাবু ? বিবিটিকে নিয়ে কোথায় হাওয়া খেতে যাচ্ছেন ? সব মজা আপনি নেবেন ? আমরা কি বানের জলে ভেসে এসেছি?"
নীল ভয়ে ঘামছিল , ওরা তারপর পাপড়িকে বলল , " কি বিবিসাব ? মাঝে মাঝে এই বান্দাদের নিয়েও হাওয়া খেতে যেতে পারেন তো ! " হ্যা হ্যা করে হাসছিল ওরা । রাগে অপমানে পাপড়ির মুখ লাল ।নীল তখনো চুপ , ওই শেয়ালদের ঠেলে সরিয়ে পাপড়ি ছুটে বেরিয়ে গেল , পেছনে পেছনে নীলও । তখনো ওরা অশ্লীল হাসি হাসছিল।
বাইরে বেরিয়ে পাপড়ি কেঁদে ফেলল , " তুই এত ভীতু কেন নীল ? এত বাজে কথার একটা প্রতিবাদ করলি না ? ছি ছি , কাওয়ার্ড একটা ! তুই আমার বন্ধু হওয়ার যোগ্য নোস , প্লিজ আর কখনো আমার সাথে কথা বলবি না । "
নীলকে হতভম্ব করে রেখে পাপড়ি একটা বাসে উঠে পড়লো । নীলের নিজের উপর ঘেন্না হচ্ছিল , সত্যি তো , কেন সে এত নোংরা কথার প্রতিবাদ করল না ? সে না পাপড়িকে ভালোবাসে ? ছি ! সত্যি সে কাওয়ার্ড । এর পর থেকে পাপড়ি আর কথা বলছিল না নীলের সাথে । নীল অনেকবার চেষ্টা করেছে , ক্ষমাও চেয়েছে , কিন্তু কোনো কাজ হয় নি । নীলের খুব কষ্ট হচ্ছে । পাপড়িকে ছেড়ে থাকতে পারছে না ও । কিন্তু দোষ তো নীলেরই !
আজ প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস শেষ হতে একটু দেরী হয়েছিল । ছুটির পর পাপড়ি বেরিয়ে যাচ্ছিলো , পেছনে পেছনে অপরাধ বোধে আক্রান্ত নীলও । কলেজের বাইরে সামনেটা একটু ফাঁকা ফাঁকা ছিল , অন্ধকার হয়ে আসছে , হঠাত নীল দেখল ওই শয়তান অবিনাশ আর দুটো ছেলে পাপড়িকে ঘিরে ধরেছে , অবিনাশ পাপড়ির হাত চেপে ধরেছিল , আজ আর নীল ভয় পায় না , দৌড়ে গেল সে , " ছেড়ে দাও ওকে অবিনাশ দা ! " বলল সে ।
" এই গাঁইয়া তুই সরে যা এখান থেকে । " জড়ানো গলায় বলল অবিনাশ । নীল বুঝল ওরা নেশা করে এসেছে । সে পাপড়িকে আড়াল করে দাঁড়ালো , " আমি থাকতে তোমরা পাপড়ির কোনো ক্ষতি করতে পারবে না । "
প্রথমে থমকে গেল ওরা , তারপর ঝাঁপিয়ে পড়লো নীলের ওপর , শুরু হয়ে গেল ধ্বস্তাধস্তি , হঠাত ওদের একজন একটা ছুরি বের করে নীলের বুকে চালিয়ে দিল , রক্তে ভেসে যাচ্ছিলো নীল , পাপড়ির চিৎকারে অনেক লোক ছুটে আসছিল , ওরা পালিয়ে গেল । নীলকে জড়িয়ে প্রচণ্ড কাঁদছিল পাপড়ি ।
এ্যাম্বুলেন্স এ করে নীলকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল , সঙ্গে পাপড়িও নীলের হাত চেপে ধরে বসেছিল । ভাগ্য ভালো ছুরিটা গভীরে ঢুকে যায় নি , তবে অনেকটা জুড়ে কেটে গেছে , ঠিক হয়ে যাবে নীল । পাপড়ি বলছিল , " তোর কিছু হবে না নীল , তুই ঠিক হয়ে যাবি , আমি আছি তোর সাথে । "
" আমি কি ভীতু ? কাওয়ার্ড ? বল ? আর ভীতু ভাববি না তো আমায় ? দেখলি তো আমিও প্রতিবাদ করতে জানি , আমাকে ছেড়ে যাবি না তো ! তোকে ছাড়া আমি থাকতে পারবো না পাপড়ি ।" অনেক কষ্টে বলল নীল ।
+ তুই চুপ কর , এখন কথা বলিস না , আমি সারাজীবন তোর সঙ্গে থাকবো , আমিও তোকে ছেড়ে থাকতে পারবো না , লাভ ইউ , লাভ ইউ নীল ! " কাঁদছিল পাপড়ি ।
অনেক কষ্টেও নীলের মুখে হাসি ফুটল , " কিন্তু অবিনাশ তো ছাড়বে না তোকে। আর তুই আগে তো বলিস নি তুই আমাকে ভালবাসিস ? "
" অবিনাশদের পুলিশে ধরিয়ে দেবো আমি , আমি সাক্ষী দেবো , তুই চুপ কর , আর মেয়েরা কি আগে প্রপোজ করে ? আমি অপেক্ষা করছিলাম , কবে তুই বলবি তোর মনের কথা । " চোখে জল নিয়ে হাসছিল পাপড়িও ।
(সমাপ্ত)