
পলাশ
রোল নাম্বার চল্লিশ! সারা ক্লাস জুড়ে অদ্ভুত নীরবতা! সেই অদ্ভুত প্রেজেন্ট স্যর কন্ঠটা আজ আর রিন রিন করে বেজে উঠল না! আবারো ডাকলাম চল্লিশ! পলাশ মন্ডল! বাকি ছাত্র গুলো এ ওর মুখ দেখছে দেখলাম! বুঝে গেলাম অ্যাবসেন্ট! এই নিয়ে আজ পাঁচ দিন কামাই করল ছেলেটা! পড়াশোনায় একেবারে গবেট! তাও আমার কাছে ও একটা অদ্ভুত কারণে স্নেহের পাত্র হয়ে উঠেছে! মুখে অদ্ভুত রকম সব আওয়াজ করতে পারে ছেলেটি! একদিন ক্লাসে ঘু ঘু র ডাক নকল করছিল পলাশ! আমি ক্লাসে ঢুকে গেছি ব্যাটা খেয়াল করেনি সে! আপন খেয়ালে প্রকৃতির আওয়াজ কে সে নিজের ক্লাসঘরে নিয়ে এসেছে! সবাই ভয়ে সিঁটিয়ে রয়েছে! এই বুঝি অরিন্দম স্যর বকাঝকা আরম্ভ করলেন! আমি আস্তে করে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম! চোখ বুজে ঘু ঘু র ডাক নকল করে চলেছে পলাশ! আমি আস্তে করে মাথায় হাত দিতেই আওয়াজ থেমে গেল! হতচকিত হয়ে দাঁড়াতে গিয়েই পড়ে যাচ্ছিল! আমি তাড়াতাড়ি ধরে ফেললাম! পলাশ ভাল করে দাঁড়াতে পারে না! একটা পা পোলিও তে অনেক ছোটবেলায় নষ্ট হয়ে গিয়েছিল! টেনে টেনে হাঁটে! বাবা মিস্ত্রীর কাজ করে! শোনা যায় পলাশের মা টাকে নাকি ওর বাবা আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে! কিন্তু প্রমাণাভাবে বেকসুর খালাস পেয়ে যায়! এক বোন আছে! সেই দাদাকে ছুটির পরে ধরে বাড়ি নিয়ে যায়! বোনটি যখন দাদাকে ধরে নিয়ে যায় তখন নিঃশব্দে তাদের চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থাকি! ভাবি মা হারা এই দুটি শিশুর ভবিষ্যৎ! কখন চোখের কোনে জল এসে যায় নিজেও বুঝি না! সেই পলাশ আজ পাঁচ দিন হল অনুপস্থিত! ক্লাসরুম থেকে আর বিদঘুটে আওয়াজ ভেসে আসেনা! অভ্যস্ত কর্ণকুহর প্রতিদিন আওয়াজের উৎস খোঁজার ব্যর্থ চেষ্টা করে! রোল চল্লিশের ঘরের খোপ গুলো অনুপস্থিতির বিন্দু দাগে ভরে যায়! তবুও পলাশ আসে না! মনের মধ্যে একটা আশংকা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে-
ফুল ঝড়ে গেল না তো? নিজের মনকেই প্রবোধ দিই আসবে একদিন নিশ্চই আসবে! কিন্তু আসে না! ভোজবাজির মত বাতাসে উবে গিয়েছে বেমালুম!
প্রতিবছরের মত এবারেও স্কুলে পুজোর আগে বিচিত্রানুষ্ঠান হতে চলেছে! মন খুব খারাপ! পলাশ এবার নেই! আশ্চর্য ব্যাপার ছেলেটার খবর কেউ এনে দিতে পারল না! অবশ্য না দিতে পারার কারণ আছে! ওর বাড়ি স্কুল থেকে এতটাই দূর যে খবর নেওয়া সম্ভব হয় নি! যাই হোক রিহার্সাল পুরোদমে চলছে! পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন ক্লাসের ছেলেমেয়েরা রিহার্সালে নাম দিতে আসছে! নামগুলি তালিকা ভুক্ত করার ভার পড়েছে আমার উপর! কিন্তু প্রতিবারের মত হরবোলা অনুষ্ঠান টা আর হবে না! কারণ এই অনুষ্ঠানে পলাশের জুড়ি মেলা ভার! পলাশ ছাড়া আর কারুর পক্ষে সম্ভবও নয় গলা দিয়ে ওরকম বিচিত্র আওয়াজ বের করা! এবার মরিয়া হয়ে উঠলাম! যেমন করেই হোক পলাশকে ফিরিয়ে এনে স্কুলে হরবোলার অনুষ্ঠান চালু করতেই হবে! পলাশের বাড়ি সেই সুদূর সরবেরিয়া! স্কুল থেকে পাক্কা দুই আড়াই ঘন্টার পথ! নদীপথে অনেকটা যেতে হবে! এটা নিয়ে হেড স্যরের সাথে কথা বলব মনস্থির করলাম! কিন্তু হেডস্যরকে বলতেই পরিস্থিতি বিগড়ে গেল! স্যর কিছুতেই আমাকে ছাড়তে রাজি ছিলেন না! এত বড় রিহার্সাল ছেলেমেয়েদের নাম ঠিক করা,অনুষ্ঠান সূচী তৈরি করা পুরো ব্যাপারটাই ছিল আমার কাঁধে! আমি না থাকলে রিহার্সাল বন্ধ হয়ে যাবে এটাই ছিল স্যরের যুক্তি! আর আমিও পলাশকে দিয়ে হরবোলার অনুষ্ঠান টা করানোর ব্যাপারে ছিলাম বদ্ধ পরিকর! অবশেষে আমার অনমনীয় জিদ জয়ী হল! একটু সকাল সকাল স্থানীয় এক ছাত্রকে নিয়ে স্কুল থেকে বেরিয়ে পড়লাম পলাশের বাড়ির উদ্দেশ্যে! একে তো নতুন জায়গা,কিছুই চিনিনা! তায় নদীপথ! উত্তেজনায় বুকটা ঢিপঢিপ করতে লাগল! পারব তো পলাশকে ফিরিয়ে আনতে?? ওর বোনটারই বা কি হল কে জানে? সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে স্টিমারে উঠে বসলাম! জল কেটে তরতর করে এগিয়ে চলল আমাদের আকাশগঙ্গা! স্টিমারের নাম! এখানে স্টিমারগুলোর এরকম অদ্ভুত নাম দেওয়া হয়! যত এগোচ্ছিলাম দুই ধারের সুন্দরবনের সবুজ বনানীর রেখা মনকে উদাস করে দিচ্ছিল! দুইধারে নদীর পাঁকে সুন্দরি গাছের মানচিত্র আপন সারল্যে মন উদাস করে দিচ্ছিল আমার! নদীর ঠান্ডা হাওয়াতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম নিজেও জানিনা! আচমকা সম্বিৎ পেলাম স্টিমারের ভোঁ শব্দে! তাকিয়ে দেখি স্টিমার ঘাটে ভিড়েছে! আশেপাশে যারা ছিল তারাও নেমে গেছে অনেকক্ষণ! আবার সেই টেনশন আরম্ভ হল! সাথে বুকের ঢিপঢিপানি টাও পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলল! পাশের ছাত্রটি এতক্ষণ ধরে আমাকে লক্ষ্য করছিল! এবার সাহস নিয়ে বলল "স্যর আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে?"
আমি তাড়াতাড়ি সহজ হয়ে বললাম - না না কোথায়? চল নামি! দুজনে স্টীমার থেকে নেমে গাঁ বরাবর হেঁটে চললাম আমরা দুজন! মেঠো দেহাতি পথ, মাঝে মাঝে গর্ত! গতদিন মনে হয় খুব বৃষ্টি হয়েছিল! গর্তগুলোতে জল জমে সে এক বিচিত্র শোভা যোগ করেছে! আর আশেপাশের নাম না জানা গাছের আড়াল থেকে কত রকমের পাখির শিস আকাশ বাতাস মুখর করে তুলেছে! প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চ যেন! বুঝলাম পলাশ এই ডাকগুলিকেই কন্ঠে ধারণ করেছে এক অদ্ভুত ক্ষমতায়! মাঝে মাঝে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে খেই হারিয়ে ফেলতাম আমি! কি অদ্ভুত মায়াবী চোখ দুখানি! রোল কল করার সময় বিচিত্র সুরে তার উপস্থিতি জানান দিত! আর সারা ক্লাসে হাসির রোল উঠত! বুঝে যেতাম হরবোলা এসেছে আজ স্কুলে! এসব ভাবতে ভাবতে কতক্ষণ তন্ময় হয়ে হেঁটে চলেছিলাম খেয়াল নেই! আচমকা ছাত্রটির ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেলাম! তাকিয়ে দেখি রাস্তাটা বাঁদিকে বেঁকে নদীর ধার দিয়ে অনেকটা নীচে নেমে গিয়েছে! আর তার ধারেই একটা ছাউনি দেওয়া মাটির বাড়ি! কয়েকটা ছাগল ইতস্ততভাবে চরে বেড়াচ্ছে! ছাত্রটি পাশ থেকে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল- স্যর! পলাশের বাড়ি! একবুক আশা নিয়ে মাথা বাঁচিয়ে বাড়ির ভিতরে পা দিতেই পিছন থেকে আবার বেয়াড়া টান!
- স্যর আমি যাবনা! আপনি যান! একটু অবাক হলাম! - কেন রে! কি হয়েছে? আমি তো আছি! আয়!
- না স্যর! আমি যাবনা!
স্পষ্ট দেখলাম ছাত্রটির চোখেমুখে একটা ভয়ের ছাপ! আমি একটু হতভম্ব হয়ে গেলাম! ইতস্তত করে ভিতরে পা দিয়েই বুঝলাম ভয়ের কারণ টা! একটা পেল্লাই সাইজের রামছাগল খুঁটিতে বাঁধা! ছটফট করছে! ওর একটা গুঁতো খেলে আমরা তো আমরা, একটা ছাগলের পাল ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে!! তার পাশেই একটা দেহাতি বুড়ো পরনে নোংরা ধুতি, বোতল থেকে কি একটা সাদা তরল গলায় ঢালছে! গোটা ঘরটা তারই অসহ্য সৌরভে ভরে উঠেছে! এ যে পলাশের বাপ বুঝতে বিলম্ব হলনা! আশে পাশে তাকিয়ে পলাশ বা তার বোন কে দেখতে পেলাম না! একটু গলা খাঁকারি দিলাম! বুড়োটার কোন ভাবান্তর দেখা গেল বলে মনে হল না! একটু সাহস করে বললাম
- পলাশ আছে??
- হুঁউউউ....!
- বলছিলাম পলাশ আছে? আমি ওর স্কুলের মাষ্টার মশাই!
- অ! মাস্টর!!!!! তা একানে কি করতে এয়েচেন??
- আজ্ঞে বলছিলাম আমাদের স্কুলে প্রতিবছর পুজোর আগে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়! আপনার ছেলের হরবোলার ডাক প্রতিবছর খুব সাড়া ফেলে দেয়! এইবছর ও তাই........
- তা আমাকে কি করতে হবে মাষ্টার?... কথা শেষ করতে দেয়না লোকটি!
- খানিকটা দমে গেলাম! ওকে একটু ডেকে দিন না!
কথাটা শেষ না হতেই ময়লা ধুতি পরা দেহাতী বুড়ো টা কেমন যেন খ্যানখেনে গলায় হেসে উঠল! ভয়ে ভয়ে আড় চোখে তাখিয়ে দেখলাম খুঁটিতে বাঁধা ছাগলটাও আমার দিকে দাঁত বের করে জাবর কাটছে! হাসছে নাকি! গা জ্বলে গেল! তেড়ে জিজ্ঞেস করলুম
- কি হল? এত হাসছেন কেন?
- উ তো আর আসবেনি মাসটার!
- কেন আসবে না কেন? কি হয়েছে তার? আপনার মেয়ে কোথায়? তাকেও তো দেখছি না!
- অনেক দূর চলি গেছে! অনেক দূর!
চমকে উঠলাম শেষ কথাটা শুনে! চলি গেছে মানে! জিজ্ঞেস করলাম
- কোথায় গেছে?? কোন উত্তর পেলাম না! বুড়ো ততক্ষণে নেশার কোলে ঢলে পড়েছে!
তিতিবিরক্ত হয়ে বেড়িয়ে এলাম মাটির বাড়িটা থেকে! আমার ছাত্রটি এতক্ষণ দাওয়ায় বসে ঢুলছিল! আমার পায়ের শব্দ শুনেই ধড়মড় করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল
- কি হল স্যর? পলাশের খোঁজ পেলেন?
- সংখেপে বললাম না!
- কি হবে স্যর আমাদের ফাংশানের?
- জানিনা! চুপ করতো!
- ধমক খেয়ে ছাত্রটি গুম হয়ে গেল! আমি ধপ করে মাটির দাওয়ায় বসে আকাশপাতাল ভাবতে লাগলাম কি হল ওদের দুজনের?
- স্যর একটা কথা বলব? অনেক্ষণ পর ছাত্রটি নীরবতা ভঙ্গ করে বলে উঠল! স্যর! আকাশের অবস্থা ভাল নয়! চলুন এবার যাই! সন্ধের আগে ফিরতে হবে!
- ছেলেটির কথায় সম্বিৎ পেয়ে দেখি পুবের আকাশ কালো করে এসেছে! ছাত্রটিকে বললাম চল! তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ি! রাস্তায় যে কজন চাষাভুষো মানুষকে দেখলাম তারা কেউই পলাশ কে চেনেনা! একটু অবাক লাগল! পলাশের বাবার এই অদ্ভুত কথাবার্তা আর এই অদ্ভুত পরিবেশ সবটা মিলিয়ে কেমন যেন গা ছমছম করে উঠল!
ঘন বাঁশবনের পাশ দিয়ে রাস্তাটা বাঁদিকে ঘাটের দিকে এগিয়েছে! সে রাস্তাটা বরাবর এগোতেই ধারে কাছেই কোথাও একটা কান ফাটান বাজ পড়ল! আমি আর ছেলেটি চুপ করে একটা ঘন বাঁশঝাড়ের নীচে দাঁড়িয়ে পড়লাম! বাঁশঝাড়ের উপর তখন উন্মাদ নৃত্য শুরু হয়ে গিয়েছে! দু এক ফোঁটা বৃষ্টির জল আমাদের নাকে এসে লাগল! অন্ধকারের মধ্যে ছাত্রটি দেখি একদৃষ্টে সামনের দিকে চেয়ে আছে! ঠেলা মারতেই বলে উঠল
- সর্বনাশ করেছে স্যর! মনে হচ্ছে আমরা পথভোলা পেত্নীর খপ্পড়ে পরেছি! না হলে ঘাটের রাস্তা এখান থেকে কিছু দেখতে পাচ্ছি না কেন?? শেষটায় তার গলাটা কেঁপে গেল মনে হয়!
- বললাম পথভোলা পেত্নী আবার কি রে?
- স্যর আছে একজন স্যর! অচেনা কেউ এই গাঁয়ে এলে তাকে পথে ঘুরিয়েই মেরে ফেলে!
- আগে বলিসনি কেন হতভাগা? জানলে আমি আসতুম ই না এই অজ গাঁয়! ছাত্রটি কিছু না বলে এদিক ওদিক তাকাতে লাগল! আচমকা ওপরে তাকিয়ে হিস্টিরিয়া রোগীর মত কাঁপতে লাগল! ওর দেখাদেখি আমিও ওপরের দিকে তাকিয়ে যা দেখলাম রক্ত হিম হয়ে গেল আমার! দেখলাম ওপরের বাঁশঝাড়ের অন্ধকারের মধ্যে একটা সাদা শাড়ি পড়া মাঝবয়সী মেয়েলোক! চোখদুটি অস্বাভাবিক পাণ্ডুর বর্ণ! আমাদের কে দেখে যাচ্ছে! আমি একমূহুর্তে আর দাঁড়ালাম না! ছাত্রটিকে শুধু একটি বার বললাম দৌড়া! তারপর ই শুরু হল আমাদের দৌড় প্রতিযোগিতা! বলা বাহুল্য আমার ছাত্রটি এই কর্মে চ্যাম্পিয়ন! নিমেষে আমি তার থেকে অনেকটাই পিছিয়ে পড়লাম! জলকাদা ভেঙে দৌড়াতে গিয়ে একটা অদ্ভুত ফিলিং হল! মনে হল কে যেন মাথার উপর ঝুলছে! উপরে তাকিয়ে যা দেখলাম হাড় হিম হয়ে গেল আমার! এক অপার্থিব নারী শরীর আমার উপর শূন্যে প্রায় ঝুঁকে আছে! আমার আর কোন জ্ঞান নেই!
জ্ঞান যখন ফিরল তখন চারদিকে ঘুটঘুটে আঁধার! ছাত্রটির ও আশেপাশে দেখা পেলাম না! ঘন বাঁশ ঝাড়ের ভিতর থেকে ঝিঁঝিঁ র ডাক ভেসে আসছে! সারা শরীর আমার জলকাদায় মাখামাখি! উঠে দাঁড়ালাম! কিন্তু যাব কোনদিকে? পথ হারিয়ে বিদেশ বিভুঁইয়ে ব্যামভোলা হয়ে গেছি!মাথা কাজ করছেনা! মনে মনে আমার ছাত্রের আর ওই রামছাগল টার মুণ্ডপাত করছি আচমকা ঠিক তখনই পিছনের বাঁশবন থেকে রামছাগলের রাম চিৎকার ভেসে এল! শিউরে উঠলাম! ভুতের হাত থেকে ছাড়া পেয়েছি! ওই অলুক্ষুণে দাড়িয়ালা প্রাণীটির সাথে এঁটে উঠতে গেলে আমাকে উসেন বোল্ট হতে হবে যেটা সাত জন্মেও সম্ভব নয়! গুটি গুটি পায়ে শব্দটার কাছাকাছি যেতেই চরম বিস্ময়! দেখি পলাশ!!! দুর্যোগ কেটে যাবার পর আকাশে যেটুকু চাঁদ ছিল তারই আবছা আলোয় দেখলাম নরম একটা ঢিপির উপর সে আর তার বোনটি বসে আছে! রামছাগলের ডাকটি সেই নকল করছিল! কিরকম যেন রাগ হল! সারাদিন গোরুখোঁজা খুঁজলাম তখন বাবুর পাত্তা নেই আর এখন পথ হারিয়ে পরকালের চিন্তা করছি তখন বাবুর খেয়াল হল! হাঁক ছাড়লাম
- এই হতভাগা! এদিকে আয়! কোথায় ছিলি সারা দিন! দুই ভাইবোনের দেখা পর্যন্ত পেলাম না!
- আপনি চাইলেও আমি আসতে পারতাম না স্যর! গলায় যেন কেমন একটা বিষাদের সুর ঠেকল আমার কাছে! জিজ্ঞেস করলুম
- কেন রে! কি হয়েছে? তোদের মুখ চোখ এত শুকনো কেন!
- দাদার খুব ব্যথা করছে স্যর! বোন টা এতক্ষণ পরে বলে উঠল!
- কি হয়েছে! পড়ে টড়ে গেছিস নাকি! কোথায় লেগেছে দেখা!
- পায়ে স্যর! দেখলাম পলাশ বোনটিকে চিমটি কাটল! কিছু একটা যেন চেপে যেতে চাইছে ওরা!
- দেখি কোথায় লেগেছে!
- থাক না স্যর! আপনি আবার পায়ে হাত দিলে লজ্জা লাগে!
- মারব থাবড়া! পা দেখা! তোকে খুঁজতে এসে আমার হাড় ইষ্টক খাক হয়ে গেল! অগত্যা পাটা টেনে নিয়ে কোলের উপর রেখে দেখলাম গোড়ালির দুই ইঞ্চি উপরে দুটো সমদূরত্বে গভীর ফুটো! চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে সেখান থেকে! আমি বোনটি কে বললাম গাঁদাল পাতা নিয়ে আসতে! এই অজগাঁয় এর থেকে ভাল চিকিৎসে আর বোধকরি কিছু নেই! বোনটা একটু পরেই কোথা থেকে গাঁদাল পাতা নিয়ে আসল! আমি একটু ঘষে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিলাম! রক্ত পড়া তো বন্ধ হোক আগে!
- স্যর আপনি কি জন্য এসেছিলেন বললেন না তো?
- আমাদের স্কুলে ফাংশন এ তোকে লাগবে রে পাগল! হরবোলা র অনুষ্ঠান তোকে ছাড়া ভাবা যায়?
- সত্যি? কবে ফাংশন স্যর? পলাশের চোখে মুখে উৎসাহ!
- এই তো পুজোর আগেই! রিহার্সাল চলছে স্কুলে! তুই স্কুলে আয়!
- আসব স্যর তবে দিনের বেলায় আসতে পারব না! সমস্যা আছে! সন্ধে বেলায় আসব!
- সেকিরে! সাড়ে চারটেয় স্কুল ছুটি হয়ে যায়! তখন এলে হবে?
- না স্যর! প্লিজ স্যর! আপনি থাকলেই হবে! গলায় যেন আকুতি ঝড়ে পড়ছে!
- স্যর আমি আপনাদের স্কুলের নাম ডোবাব না! কাজ উদ্ধার করবই! যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া মুখখানি থেকে এরকম দৃঢ় বাক্য সত্যি খুব অবাক লাগল!
- স্যর আপনাকে এগিয়ে দিই! সোমনাথকে নিয়ে এসেছেন না সাথে? ভিতুর ডিম একটা! আপনার বিপদ দেখে পিঠটান দিয়েছে! আমি থাকলে আপনার কিছুই হত না স্যর!
- তুই খুব সাহসী হয়ে গেছিস এ কদিনে মনে হচ্ছে!
- এখন হয়েছি স্যর! দায়ে পড়ে!
পলাশের শেষ কথাটা আমার কানে কিরকম যেন ঠেকল! বললাম মানে? কি বলতে চাইছিস!
ঠিক তখনই ঘাটের দিক থেকে অনেক মানুষের কোলাহল শুনতে পেয়ে ধড়ে প্রাণ এল! সোমনাথ কে দেখতে পেলাম ভিড়ের মধ্যে! আমাকে দেকেই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল!
- স্যর কোথায় ছিলেন আপনি! অনেক কষ্টে এতগুলো লোককে জড়ো করতে পেরেছি! কোথায় ছিলেন আপনি!
- বাঁশবনের পাশে অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম! পলাশ আর তার বোন আমাকে উদ্ধার করে আমাকে ঘাট পর্যন্ত নিয়ে এসেছে!
- আপনি কাদের কথা বলছেন স্যর?
- এই তো! পলাশ! দেখাতে গিয়ে নিজেই বেকুব হয়ে গেলাম! কোথায় কে? খাঁ খাঁ করছে মাটির পোড়ো রাস্তা! দুজনে যেন ভাঙা চাঁদের আলোয় জোনাকির ঝাঁকের।মধ্যেই মিলিয়ে গেছে!
- স্যর আপনি চলে আসুন! আপনাকে ধরছি! আসুন!
- কোনরকমে টলতে টলতে নৌকায় উঠলাম! লোক গুলোর কাছে খবর পেলাম দিন সাতেক আগে পলাশ আর তার বোন সাপের কামড়ে মারা গেছে! তার বাবা ডাক্তারের কাছে না গিয়ে ঝাঁড়ফুক করেছিল অসহায় দুটি প্রাণকে! বাঁচাতে পারেনি! কলার ভেলায় দুই ভাইবোন কে ভাসিয়ে দিয়েছে! নদী আপন বেগে দুটি প্রাণ কে নিয়ে গেছে কোন অজানার উদ্দেশ্যে! চোখের জল আর বাঁধা মানল না! মা মরা দুটি শিশু এভাবে তাদের মায়ের কাছে যাত্রা করবে ঘুণাক্ষরেও ভাবি নি! নদীর জলে ভাঙা জোৎস্নার আলোয় দাঁড়ের আঘাত রাত্রির নিঃস্তব্ধতাকে খান খান করে দিচ্ছিল! দূর থেকে কোথাও রাত পেঁচার ডাক ভেসে আসছিল! সেদিকে তাকিয়ে বুক ভাঙা নিঃশ্বাস ফেলে বললাম ভাল থাক পলাশ! পরজন্মে যেন ভাল শিল্পী হয়ে জন্মাস!
পুনশ্চ - আমাদের স্কুলে ফাংশন খুব কৃতিত্বের সাথে পালন করা হয়েছিল! আর হ্যাঁ......পলাশ কথা রেখেছিল! কোলকাতা থেকে ভাড়া করে আনা এক হরবোলা শিল্পীর কন্ঠ রোধ করে নিজের কন্ঠই শেষবারের মত শুনিয়ে ইহলোক ত্যাগ করেছিল পলাশ......সমস্ত মায়ার বাঁধন কাটিয়ে! আর ফিরে আসেনি!
ফুল ঝড়ে গেল না তো? নিজের মনকেই প্রবোধ দিই আসবে একদিন নিশ্চই আসবে! কিন্তু আসে না! ভোজবাজির মত বাতাসে উবে গিয়েছে বেমালুম!
প্রতিবছরের মত এবারেও স্কুলে পুজোর আগে বিচিত্রানুষ্ঠান হতে চলেছে! মন খুব খারাপ! পলাশ এবার নেই! আশ্চর্য ব্যাপার ছেলেটার খবর কেউ এনে দিতে পারল না! অবশ্য না দিতে পারার কারণ আছে! ওর বাড়ি স্কুল থেকে এতটাই দূর যে খবর নেওয়া সম্ভব হয় নি! যাই হোক রিহার্সাল পুরোদমে চলছে! পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন ক্লাসের ছেলেমেয়েরা রিহার্সালে নাম দিতে আসছে! নামগুলি তালিকা ভুক্ত করার ভার পড়েছে আমার উপর! কিন্তু প্রতিবারের মত হরবোলা অনুষ্ঠান টা আর হবে না! কারণ এই অনুষ্ঠানে পলাশের জুড়ি মেলা ভার! পলাশ ছাড়া আর কারুর পক্ষে সম্ভবও নয় গলা দিয়ে ওরকম বিচিত্র আওয়াজ বের করা! এবার মরিয়া হয়ে উঠলাম! যেমন করেই হোক পলাশকে ফিরিয়ে এনে স্কুলে হরবোলার অনুষ্ঠান চালু করতেই হবে! পলাশের বাড়ি সেই সুদূর সরবেরিয়া! স্কুল থেকে পাক্কা দুই আড়াই ঘন্টার পথ! নদীপথে অনেকটা যেতে হবে! এটা নিয়ে হেড স্যরের সাথে কথা বলব মনস্থির করলাম! কিন্তু হেডস্যরকে বলতেই পরিস্থিতি বিগড়ে গেল! স্যর কিছুতেই আমাকে ছাড়তে রাজি ছিলেন না! এত বড় রিহার্সাল ছেলেমেয়েদের নাম ঠিক করা,অনুষ্ঠান সূচী তৈরি করা পুরো ব্যাপারটাই ছিল আমার কাঁধে! আমি না থাকলে রিহার্সাল বন্ধ হয়ে যাবে এটাই ছিল স্যরের যুক্তি! আর আমিও পলাশকে দিয়ে হরবোলার অনুষ্ঠান টা করানোর ব্যাপারে ছিলাম বদ্ধ পরিকর! অবশেষে আমার অনমনীয় জিদ জয়ী হল! একটু সকাল সকাল স্থানীয় এক ছাত্রকে নিয়ে স্কুল থেকে বেরিয়ে পড়লাম পলাশের বাড়ির উদ্দেশ্যে! একে তো নতুন জায়গা,কিছুই চিনিনা! তায় নদীপথ! উত্তেজনায় বুকটা ঢিপঢিপ করতে লাগল! পারব তো পলাশকে ফিরিয়ে আনতে?? ওর বোনটারই বা কি হল কে জানে? সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে স্টিমারে উঠে বসলাম! জল কেটে তরতর করে এগিয়ে চলল আমাদের আকাশগঙ্গা! স্টিমারের নাম! এখানে স্টিমারগুলোর এরকম অদ্ভুত নাম দেওয়া হয়! যত এগোচ্ছিলাম দুই ধারের সুন্দরবনের সবুজ বনানীর রেখা মনকে উদাস করে দিচ্ছিল! দুইধারে নদীর পাঁকে সুন্দরি গাছের মানচিত্র আপন সারল্যে মন উদাস করে দিচ্ছিল আমার! নদীর ঠান্ডা হাওয়াতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম নিজেও জানিনা! আচমকা সম্বিৎ পেলাম স্টিমারের ভোঁ শব্দে! তাকিয়ে দেখি স্টিমার ঘাটে ভিড়েছে! আশেপাশে যারা ছিল তারাও নেমে গেছে অনেকক্ষণ! আবার সেই টেনশন আরম্ভ হল! সাথে বুকের ঢিপঢিপানি টাও পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলল! পাশের ছাত্রটি এতক্ষণ ধরে আমাকে লক্ষ্য করছিল! এবার সাহস নিয়ে বলল "স্যর আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে?"
আমি তাড়াতাড়ি সহজ হয়ে বললাম - না না কোথায়? চল নামি! দুজনে স্টীমার থেকে নেমে গাঁ বরাবর হেঁটে চললাম আমরা দুজন! মেঠো দেহাতি পথ, মাঝে মাঝে গর্ত! গতদিন মনে হয় খুব বৃষ্টি হয়েছিল! গর্তগুলোতে জল জমে সে এক বিচিত্র শোভা যোগ করেছে! আর আশেপাশের নাম না জানা গাছের আড়াল থেকে কত রকমের পাখির শিস আকাশ বাতাস মুখর করে তুলেছে! প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চ যেন! বুঝলাম পলাশ এই ডাকগুলিকেই কন্ঠে ধারণ করেছে এক অদ্ভুত ক্ষমতায়! মাঝে মাঝে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে খেই হারিয়ে ফেলতাম আমি! কি অদ্ভুত মায়াবী চোখ দুখানি! রোল কল করার সময় বিচিত্র সুরে তার উপস্থিতি জানান দিত! আর সারা ক্লাসে হাসির রোল উঠত! বুঝে যেতাম হরবোলা এসেছে আজ স্কুলে! এসব ভাবতে ভাবতে কতক্ষণ তন্ময় হয়ে হেঁটে চলেছিলাম খেয়াল নেই! আচমকা ছাত্রটির ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেলাম! তাকিয়ে দেখি রাস্তাটা বাঁদিকে বেঁকে নদীর ধার দিয়ে অনেকটা নীচে নেমে গিয়েছে! আর তার ধারেই একটা ছাউনি দেওয়া মাটির বাড়ি! কয়েকটা ছাগল ইতস্ততভাবে চরে বেড়াচ্ছে! ছাত্রটি পাশ থেকে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল- স্যর! পলাশের বাড়ি! একবুক আশা নিয়ে মাথা বাঁচিয়ে বাড়ির ভিতরে পা দিতেই পিছন থেকে আবার বেয়াড়া টান!
- স্যর আমি যাবনা! আপনি যান! একটু অবাক হলাম! - কেন রে! কি হয়েছে? আমি তো আছি! আয়!
- না স্যর! আমি যাবনা!
স্পষ্ট দেখলাম ছাত্রটির চোখেমুখে একটা ভয়ের ছাপ! আমি একটু হতভম্ব হয়ে গেলাম! ইতস্তত করে ভিতরে পা দিয়েই বুঝলাম ভয়ের কারণ টা! একটা পেল্লাই সাইজের রামছাগল খুঁটিতে বাঁধা! ছটফট করছে! ওর একটা গুঁতো খেলে আমরা তো আমরা, একটা ছাগলের পাল ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে!! তার পাশেই একটা দেহাতি বুড়ো পরনে নোংরা ধুতি, বোতল থেকে কি একটা সাদা তরল গলায় ঢালছে! গোটা ঘরটা তারই অসহ্য সৌরভে ভরে উঠেছে! এ যে পলাশের বাপ বুঝতে বিলম্ব হলনা! আশে পাশে তাকিয়ে পলাশ বা তার বোন কে দেখতে পেলাম না! একটু গলা খাঁকারি দিলাম! বুড়োটার কোন ভাবান্তর দেখা গেল বলে মনে হল না! একটু সাহস করে বললাম
- পলাশ আছে??
- হুঁউউউ....!
- বলছিলাম পলাশ আছে? আমি ওর স্কুলের মাষ্টার মশাই!
- অ! মাস্টর!!!!! তা একানে কি করতে এয়েচেন??
- আজ্ঞে বলছিলাম আমাদের স্কুলে প্রতিবছর পুজোর আগে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়! আপনার ছেলের হরবোলার ডাক প্রতিবছর খুব সাড়া ফেলে দেয়! এইবছর ও তাই........
- তা আমাকে কি করতে হবে মাষ্টার?... কথা শেষ করতে দেয়না লোকটি!
- খানিকটা দমে গেলাম! ওকে একটু ডেকে দিন না!
কথাটা শেষ না হতেই ময়লা ধুতি পরা দেহাতী বুড়ো টা কেমন যেন খ্যানখেনে গলায় হেসে উঠল! ভয়ে ভয়ে আড় চোখে তাখিয়ে দেখলাম খুঁটিতে বাঁধা ছাগলটাও আমার দিকে দাঁত বের করে জাবর কাটছে! হাসছে নাকি! গা জ্বলে গেল! তেড়ে জিজ্ঞেস করলুম
- কি হল? এত হাসছেন কেন?
- উ তো আর আসবেনি মাসটার!
- কেন আসবে না কেন? কি হয়েছে তার? আপনার মেয়ে কোথায়? তাকেও তো দেখছি না!
- অনেক দূর চলি গেছে! অনেক দূর!
চমকে উঠলাম শেষ কথাটা শুনে! চলি গেছে মানে! জিজ্ঞেস করলাম
- কোথায় গেছে?? কোন উত্তর পেলাম না! বুড়ো ততক্ষণে নেশার কোলে ঢলে পড়েছে!
তিতিবিরক্ত হয়ে বেড়িয়ে এলাম মাটির বাড়িটা থেকে! আমার ছাত্রটি এতক্ষণ দাওয়ায় বসে ঢুলছিল! আমার পায়ের শব্দ শুনেই ধড়মড় করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল
- কি হল স্যর? পলাশের খোঁজ পেলেন?
- সংখেপে বললাম না!
- কি হবে স্যর আমাদের ফাংশানের?
- জানিনা! চুপ করতো!
- ধমক খেয়ে ছাত্রটি গুম হয়ে গেল! আমি ধপ করে মাটির দাওয়ায় বসে আকাশপাতাল ভাবতে লাগলাম কি হল ওদের দুজনের?
- স্যর একটা কথা বলব? অনেক্ষণ পর ছাত্রটি নীরবতা ভঙ্গ করে বলে উঠল! স্যর! আকাশের অবস্থা ভাল নয়! চলুন এবার যাই! সন্ধের আগে ফিরতে হবে!
- ছেলেটির কথায় সম্বিৎ পেয়ে দেখি পুবের আকাশ কালো করে এসেছে! ছাত্রটিকে বললাম চল! তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ি! রাস্তায় যে কজন চাষাভুষো মানুষকে দেখলাম তারা কেউই পলাশ কে চেনেনা! একটু অবাক লাগল! পলাশের বাবার এই অদ্ভুত কথাবার্তা আর এই অদ্ভুত পরিবেশ সবটা মিলিয়ে কেমন যেন গা ছমছম করে উঠল!
ঘন বাঁশবনের পাশ দিয়ে রাস্তাটা বাঁদিকে ঘাটের দিকে এগিয়েছে! সে রাস্তাটা বরাবর এগোতেই ধারে কাছেই কোথাও একটা কান ফাটান বাজ পড়ল! আমি আর ছেলেটি চুপ করে একটা ঘন বাঁশঝাড়ের নীচে দাঁড়িয়ে পড়লাম! বাঁশঝাড়ের উপর তখন উন্মাদ নৃত্য শুরু হয়ে গিয়েছে! দু এক ফোঁটা বৃষ্টির জল আমাদের নাকে এসে লাগল! অন্ধকারের মধ্যে ছাত্রটি দেখি একদৃষ্টে সামনের দিকে চেয়ে আছে! ঠেলা মারতেই বলে উঠল
- সর্বনাশ করেছে স্যর! মনে হচ্ছে আমরা পথভোলা পেত্নীর খপ্পড়ে পরেছি! না হলে ঘাটের রাস্তা এখান থেকে কিছু দেখতে পাচ্ছি না কেন?? শেষটায় তার গলাটা কেঁপে গেল মনে হয়!
- বললাম পথভোলা পেত্নী আবার কি রে?
- স্যর আছে একজন স্যর! অচেনা কেউ এই গাঁয়ে এলে তাকে পথে ঘুরিয়েই মেরে ফেলে!
- আগে বলিসনি কেন হতভাগা? জানলে আমি আসতুম ই না এই অজ গাঁয়! ছাত্রটি কিছু না বলে এদিক ওদিক তাকাতে লাগল! আচমকা ওপরে তাকিয়ে হিস্টিরিয়া রোগীর মত কাঁপতে লাগল! ওর দেখাদেখি আমিও ওপরের দিকে তাকিয়ে যা দেখলাম রক্ত হিম হয়ে গেল আমার! দেখলাম ওপরের বাঁশঝাড়ের অন্ধকারের মধ্যে একটা সাদা শাড়ি পড়া মাঝবয়সী মেয়েলোক! চোখদুটি অস্বাভাবিক পাণ্ডুর বর্ণ! আমাদের কে দেখে যাচ্ছে! আমি একমূহুর্তে আর দাঁড়ালাম না! ছাত্রটিকে শুধু একটি বার বললাম দৌড়া! তারপর ই শুরু হল আমাদের দৌড় প্রতিযোগিতা! বলা বাহুল্য আমার ছাত্রটি এই কর্মে চ্যাম্পিয়ন! নিমেষে আমি তার থেকে অনেকটাই পিছিয়ে পড়লাম! জলকাদা ভেঙে দৌড়াতে গিয়ে একটা অদ্ভুত ফিলিং হল! মনে হল কে যেন মাথার উপর ঝুলছে! উপরে তাকিয়ে যা দেখলাম হাড় হিম হয়ে গেল আমার! এক অপার্থিব নারী শরীর আমার উপর শূন্যে প্রায় ঝুঁকে আছে! আমার আর কোন জ্ঞান নেই!
জ্ঞান যখন ফিরল তখন চারদিকে ঘুটঘুটে আঁধার! ছাত্রটির ও আশেপাশে দেখা পেলাম না! ঘন বাঁশ ঝাড়ের ভিতর থেকে ঝিঁঝিঁ র ডাক ভেসে আসছে! সারা শরীর আমার জলকাদায় মাখামাখি! উঠে দাঁড়ালাম! কিন্তু যাব কোনদিকে? পথ হারিয়ে বিদেশ বিভুঁইয়ে ব্যামভোলা হয়ে গেছি!মাথা কাজ করছেনা! মনে মনে আমার ছাত্রের আর ওই রামছাগল টার মুণ্ডপাত করছি আচমকা ঠিক তখনই পিছনের বাঁশবন থেকে রামছাগলের রাম চিৎকার ভেসে এল! শিউরে উঠলাম! ভুতের হাত থেকে ছাড়া পেয়েছি! ওই অলুক্ষুণে দাড়িয়ালা প্রাণীটির সাথে এঁটে উঠতে গেলে আমাকে উসেন বোল্ট হতে হবে যেটা সাত জন্মেও সম্ভব নয়! গুটি গুটি পায়ে শব্দটার কাছাকাছি যেতেই চরম বিস্ময়! দেখি পলাশ!!! দুর্যোগ কেটে যাবার পর আকাশে যেটুকু চাঁদ ছিল তারই আবছা আলোয় দেখলাম নরম একটা ঢিপির উপর সে আর তার বোনটি বসে আছে! রামছাগলের ডাকটি সেই নকল করছিল! কিরকম যেন রাগ হল! সারাদিন গোরুখোঁজা খুঁজলাম তখন বাবুর পাত্তা নেই আর এখন পথ হারিয়ে পরকালের চিন্তা করছি তখন বাবুর খেয়াল হল! হাঁক ছাড়লাম
- এই হতভাগা! এদিকে আয়! কোথায় ছিলি সারা দিন! দুই ভাইবোনের দেখা পর্যন্ত পেলাম না!
- আপনি চাইলেও আমি আসতে পারতাম না স্যর! গলায় যেন কেমন একটা বিষাদের সুর ঠেকল আমার কাছে! জিজ্ঞেস করলুম
- কেন রে! কি হয়েছে? তোদের মুখ চোখ এত শুকনো কেন!
- দাদার খুব ব্যথা করছে স্যর! বোন টা এতক্ষণ পরে বলে উঠল!
- কি হয়েছে! পড়ে টড়ে গেছিস নাকি! কোথায় লেগেছে দেখা!
- পায়ে স্যর! দেখলাম পলাশ বোনটিকে চিমটি কাটল! কিছু একটা যেন চেপে যেতে চাইছে ওরা!
- দেখি কোথায় লেগেছে!
- থাক না স্যর! আপনি আবার পায়ে হাত দিলে লজ্জা লাগে!
- মারব থাবড়া! পা দেখা! তোকে খুঁজতে এসে আমার হাড় ইষ্টক খাক হয়ে গেল! অগত্যা পাটা টেনে নিয়ে কোলের উপর রেখে দেখলাম গোড়ালির দুই ইঞ্চি উপরে দুটো সমদূরত্বে গভীর ফুটো! চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে সেখান থেকে! আমি বোনটি কে বললাম গাঁদাল পাতা নিয়ে আসতে! এই অজগাঁয় এর থেকে ভাল চিকিৎসে আর বোধকরি কিছু নেই! বোনটা একটু পরেই কোথা থেকে গাঁদাল পাতা নিয়ে আসল! আমি একটু ঘষে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিলাম! রক্ত পড়া তো বন্ধ হোক আগে!
- স্যর আপনি কি জন্য এসেছিলেন বললেন না তো?
- আমাদের স্কুলে ফাংশন এ তোকে লাগবে রে পাগল! হরবোলা র অনুষ্ঠান তোকে ছাড়া ভাবা যায়?
- সত্যি? কবে ফাংশন স্যর? পলাশের চোখে মুখে উৎসাহ!
- এই তো পুজোর আগেই! রিহার্সাল চলছে স্কুলে! তুই স্কুলে আয়!
- আসব স্যর তবে দিনের বেলায় আসতে পারব না! সমস্যা আছে! সন্ধে বেলায় আসব!
- সেকিরে! সাড়ে চারটেয় স্কুল ছুটি হয়ে যায়! তখন এলে হবে?
- না স্যর! প্লিজ স্যর! আপনি থাকলেই হবে! গলায় যেন আকুতি ঝড়ে পড়ছে!
- স্যর আমি আপনাদের স্কুলের নাম ডোবাব না! কাজ উদ্ধার করবই! যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া মুখখানি থেকে এরকম দৃঢ় বাক্য সত্যি খুব অবাক লাগল!
- স্যর আপনাকে এগিয়ে দিই! সোমনাথকে নিয়ে এসেছেন না সাথে? ভিতুর ডিম একটা! আপনার বিপদ দেখে পিঠটান দিয়েছে! আমি থাকলে আপনার কিছুই হত না স্যর!
- তুই খুব সাহসী হয়ে গেছিস এ কদিনে মনে হচ্ছে!
- এখন হয়েছি স্যর! দায়ে পড়ে!
পলাশের শেষ কথাটা আমার কানে কিরকম যেন ঠেকল! বললাম মানে? কি বলতে চাইছিস!
ঠিক তখনই ঘাটের দিক থেকে অনেক মানুষের কোলাহল শুনতে পেয়ে ধড়ে প্রাণ এল! সোমনাথ কে দেখতে পেলাম ভিড়ের মধ্যে! আমাকে দেকেই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল!
- স্যর কোথায় ছিলেন আপনি! অনেক কষ্টে এতগুলো লোককে জড়ো করতে পেরেছি! কোথায় ছিলেন আপনি!
- বাঁশবনের পাশে অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম! পলাশ আর তার বোন আমাকে উদ্ধার করে আমাকে ঘাট পর্যন্ত নিয়ে এসেছে!
- আপনি কাদের কথা বলছেন স্যর?
- এই তো! পলাশ! দেখাতে গিয়ে নিজেই বেকুব হয়ে গেলাম! কোথায় কে? খাঁ খাঁ করছে মাটির পোড়ো রাস্তা! দুজনে যেন ভাঙা চাঁদের আলোয় জোনাকির ঝাঁকের।মধ্যেই মিলিয়ে গেছে!
- স্যর আপনি চলে আসুন! আপনাকে ধরছি! আসুন!
- কোনরকমে টলতে টলতে নৌকায় উঠলাম! লোক গুলোর কাছে খবর পেলাম দিন সাতেক আগে পলাশ আর তার বোন সাপের কামড়ে মারা গেছে! তার বাবা ডাক্তারের কাছে না গিয়ে ঝাঁড়ফুক করেছিল অসহায় দুটি প্রাণকে! বাঁচাতে পারেনি! কলার ভেলায় দুই ভাইবোন কে ভাসিয়ে দিয়েছে! নদী আপন বেগে দুটি প্রাণ কে নিয়ে গেছে কোন অজানার উদ্দেশ্যে! চোখের জল আর বাঁধা মানল না! মা মরা দুটি শিশু এভাবে তাদের মায়ের কাছে যাত্রা করবে ঘুণাক্ষরেও ভাবি নি! নদীর জলে ভাঙা জোৎস্নার আলোয় দাঁড়ের আঘাত রাত্রির নিঃস্তব্ধতাকে খান খান করে দিচ্ছিল! দূর থেকে কোথাও রাত পেঁচার ডাক ভেসে আসছিল! সেদিকে তাকিয়ে বুক ভাঙা নিঃশ্বাস ফেলে বললাম ভাল থাক পলাশ! পরজন্মে যেন ভাল শিল্পী হয়ে জন্মাস!
পুনশ্চ - আমাদের স্কুলে ফাংশন খুব কৃতিত্বের সাথে পালন করা হয়েছিল! আর হ্যাঁ......পলাশ কথা রেখেছিল! কোলকাতা থেকে ভাড়া করে আনা এক হরবোলা শিল্পীর কন্ঠ রোধ করে নিজের কন্ঠই শেষবারের মত শুনিয়ে ইহলোক ত্যাগ করেছিল পলাশ......সমস্ত মায়ার বাঁধন কাটিয়ে! আর ফিরে আসেনি!
অরিন্দম @ নবপল্লী


