ভূতের গল্পো লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ভূতের গল্পো লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

পলাশ

Image may contain: 2 people, stripes and closeup

পলাশ
রোল নাম্বার চল্লিশ! সারা ক্লাস জুড়ে অদ্ভুত নীরবতা! সেই অদ্ভুত প্রেজেন্ট স্যর কন্ঠটা আজ আর রিন রিন করে বেজে উঠল না! আবারো ডাকলাম চল্লিশ! পলাশ মন্ডল! বাকি ছাত্র গুলো এ ওর মুখ দেখছে দেখলাম! বুঝে গেলাম অ্যাবসেন্ট! এই নিয়ে আজ পাঁচ দিন কামাই করল ছেলেটা! পড়াশোনায় একেবারে গবেট! তাও আমার কাছে ও একটা অদ্ভুত কারণে স্নেহের পাত্র হয়ে উঠেছে! মুখে অদ্ভুত রকম সব আওয়াজ করতে পারে ছেলেটি! একদিন ক্লাসে ঘু ঘু র ডাক নকল করছিল পলাশ! আমি ক্লাসে ঢুকে গেছি ব্যাটা খেয়াল করেনি সে! আপন খেয়ালে প্রকৃতির আওয়াজ কে সে নিজের ক্লাসঘরে নিয়ে এসেছে! সবাই ভয়ে সিঁটিয়ে রয়েছে! এই বুঝি অরিন্দম স্যর বকাঝকা আরম্ভ করলেন! আমি আস্তে করে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম! চোখ বুজে ঘু ঘু র ডাক নকল করে চলেছে পলাশ! আমি আস্তে করে মাথায় হাত দিতেই আওয়াজ থেমে গেল! হতচকিত হয়ে দাঁড়াতে গিয়েই পড়ে যাচ্ছিল! আমি তাড়াতাড়ি ধরে ফেললাম! পলাশ ভাল করে দাঁড়াতে পারে না! একটা পা পোলিও তে অনেক ছোটবেলায় নষ্ট হয়ে গিয়েছিল! টেনে টেনে হাঁটে! বাবা মিস্ত্রীর কাজ করে! শোনা যায় পলাশের মা টাকে নাকি ওর বাবা আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে! কিন্তু প্রমাণাভাবে বেকসুর খালাস পেয়ে যায়! এক বোন আছে! সেই দাদাকে ছুটির পরে ধরে বাড়ি নিয়ে যায়! বোনটি যখন দাদাকে ধরে নিয়ে যায় তখন নিঃশব্দে তাদের চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থাকি! ভাবি মা হারা এই দুটি শিশুর ভবিষ্যৎ! কখন চোখের কোনে জল এসে যায় নিজেও বুঝি না! সেই পলাশ আজ পাঁচ দিন হল অনুপস্থিত! ক্লাসরুম থেকে আর বিদঘুটে আওয়াজ ভেসে আসেনা! অভ্যস্ত কর্ণকুহর প্রতিদিন আওয়াজের উৎস খোঁজার ব্যর্থ চেষ্টা করে! রোল চল্লিশের ঘরের খোপ গুলো অনুপস্থিতির বিন্দু দাগে ভরে যায়! তবুও পলাশ আসে না! মনের মধ্যে একটা আশংকা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে-
ফুল ঝড়ে গেল না তো? নিজের মনকেই প্রবোধ দিই আসবে একদিন নিশ্চই আসবে! কিন্তু আসে না! ভোজবাজির মত বাতাসে উবে গিয়েছে বেমালুম!
প্রতিবছরের মত এবারেও স্কুলে পুজোর আগে বিচিত্রানুষ্ঠান হতে চলেছে! মন খুব খারাপ! পলাশ এবার নেই! আশ্চর্য ব্যাপার ছেলেটার খবর কেউ এনে দিতে পারল না! অবশ্য না দিতে পারার কারণ আছে! ওর বাড়ি স্কুল থেকে এতটাই দূর যে খবর নেওয়া সম্ভব হয় নি! যাই হোক রিহার্সাল পুরোদমে চলছে! পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন ক্লাসের ছেলেমেয়েরা রিহার্সালে নাম দিতে আসছে! নামগুলি তালিকা ভুক্ত করার ভার পড়েছে আমার উপর! কিন্তু প্রতিবারের মত হরবোলা অনুষ্ঠান টা আর হবে না! কারণ এই অনুষ্ঠানে পলাশের জুড়ি মেলা ভার! পলাশ ছাড়া আর কারুর পক্ষে সম্ভবও নয় গলা দিয়ে ওরকম বিচিত্র আওয়াজ বের করা! এবার মরিয়া হয়ে উঠলাম! যেমন করেই হোক পলাশকে ফিরিয়ে এনে স্কুলে হরবোলার অনুষ্ঠান চালু করতেই হবে! পলাশের বাড়ি সেই সুদূর সরবেরিয়া! স্কুল থেকে পাক্কা দুই আড়াই ঘন্টার পথ! নদীপথে অনেকটা যেতে হবে! এটা নিয়ে হেড স্যরের সাথে কথা বলব মনস্থির করলাম! কিন্তু হেডস্যরকে বলতেই পরিস্থিতি বিগড়ে গেল! স্যর কিছুতেই আমাকে ছাড়তে রাজি ছিলেন না! এত বড় রিহার্সাল ছেলেমেয়েদের নাম ঠিক করা,অনুষ্ঠান সূচী তৈরি করা পুরো ব্যাপারটাই ছিল আমার কাঁধে! আমি না থাকলে রিহার্সাল বন্ধ হয়ে যাবে এটাই ছিল স্যরের যুক্তি! আর আমিও পলাশকে দিয়ে হরবোলার অনুষ্ঠান টা করানোর ব্যাপারে ছিলাম বদ্ধ পরিকর! অবশেষে আমার অনমনীয় জিদ জয়ী হল! একটু সকাল সকাল স্থানীয় এক ছাত্রকে নিয়ে স্কুল থেকে বেরিয়ে পড়লাম পলাশের বাড়ির উদ্দেশ্যে! একে তো নতুন জায়গা,কিছুই চিনিনা! তায় নদীপথ! উত্তেজনায় বুকটা ঢিপঢিপ করতে লাগল! পারব তো পলাশকে ফিরিয়ে আনতে?? ওর বোনটারই বা কি হল কে জানে? সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে স্টিমারে উঠে বসলাম! জল কেটে তরতর করে এগিয়ে চলল আমাদের আকাশগঙ্গা! স্টিমারের নাম! এখানে স্টিমারগুলোর এরকম অদ্ভুত নাম দেওয়া হয়! যত এগোচ্ছিলাম দুই ধারের সুন্দরবনের সবুজ বনানীর রেখা মনকে উদাস করে দিচ্ছিল! দুইধারে নদীর পাঁকে সুন্দরি গাছের মানচিত্র আপন সারল্যে মন উদাস করে দিচ্ছিল আমার! নদীর ঠান্ডা হাওয়াতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম নিজেও জানিনা! আচমকা সম্বিৎ পেলাম স্টিমারের ভোঁ শব্দে! তাকিয়ে দেখি স্টিমার ঘাটে ভিড়েছে! আশেপাশে যারা ছিল তারাও নেমে গেছে অনেকক্ষণ! আবার সেই টেনশন আরম্ভ হল! সাথে বুকের ঢিপঢিপানি টাও পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলল! পাশের ছাত্রটি এতক্ষণ ধরে আমাকে লক্ষ্য করছিল! এবার সাহস নিয়ে বলল "স্যর আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে?"
আমি তাড়াতাড়ি সহজ হয়ে বললাম - না না কোথায়? চল নামি! দুজনে স্টীমার থেকে নেমে গাঁ বরাবর হেঁটে চললাম আমরা দুজন! মেঠো দেহাতি পথ, মাঝে মাঝে গর্ত! গতদিন মনে হয় খুব বৃষ্টি হয়েছিল! গর্তগুলোতে জল জমে সে এক বিচিত্র শোভা যোগ করেছে! আর আশেপাশের নাম না জানা গাছের আড়াল থেকে কত রকমের পাখির শিস আকাশ বাতাস মুখর করে তুলেছে! প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চ যেন! বুঝলাম পলাশ এই ডাকগুলিকেই কন্ঠে ধারণ করেছে এক অদ্ভুত ক্ষমতায়! মাঝে মাঝে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে খেই হারিয়ে ফেলতাম আমি! কি অদ্ভুত মায়াবী চোখ দুখানি! রোল কল করার সময় বিচিত্র সুরে তার উপস্থিতি জানান দিত! আর সারা ক্লাসে হাসির রোল উঠত! বুঝে যেতাম হরবোলা এসেছে আজ স্কুলে! এসব ভাবতে ভাবতে কতক্ষণ তন্ময় হয়ে হেঁটে চলেছিলাম খেয়াল নেই! আচমকা ছাত্রটির ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেলাম! তাকিয়ে দেখি রাস্তাটা বাঁদিকে বেঁকে নদীর ধার দিয়ে অনেকটা নীচে নেমে গিয়েছে! আর তার ধারেই একটা ছাউনি দেওয়া মাটির বাড়ি! কয়েকটা ছাগল ইতস্ততভাবে চরে বেড়াচ্ছে! ছাত্রটি পাশ থেকে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল- স্যর! পলাশের বাড়ি! একবুক আশা নিয়ে মাথা বাঁচিয়ে বাড়ির ভিতরে পা দিতেই পিছন থেকে আবার বেয়াড়া টান!
- স্যর আমি যাবনা! আপনি যান! একটু অবাক হলাম! - কেন রে! কি হয়েছে? আমি তো আছি! আয়!
- না স্যর! আমি যাবনা!
স্পষ্ট দেখলাম ছাত্রটির চোখেমুখে একটা ভয়ের ছাপ! আমি একটু হতভম্ব হয়ে গেলাম! ইতস্তত করে ভিতরে পা দিয়েই বুঝলাম ভয়ের কারণ টা! একটা পেল্লাই সাইজের রামছাগল খুঁটিতে বাঁধা! ছটফট করছে! ওর একটা গুঁতো খেলে আমরা তো আমরা, একটা ছাগলের পাল ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে!! তার পাশেই একটা দেহাতি বুড়ো পরনে নোংরা ধুতি, বোতল থেকে কি একটা সাদা তরল গলায় ঢালছে! গোটা ঘরটা তারই অসহ্য সৌরভে ভরে উঠেছে! এ যে পলাশের বাপ বুঝতে বিলম্ব হলনা! আশে পাশে তাকিয়ে পলাশ বা তার বোন কে দেখতে পেলাম না! একটু গলা খাঁকারি দিলাম! বুড়োটার কোন ভাবান্তর দেখা গেল বলে মনে হল না! একটু সাহস করে বললাম
- পলাশ আছে??
- হুঁউউউ....!
- বলছিলাম পলাশ আছে? আমি ওর স্কুলের মাষ্টার মশাই!
- অ! মাস্টর!!!!! তা একানে কি করতে এয়েচেন??
- আজ্ঞে বলছিলাম আমাদের স্কুলে প্রতিবছর পুজোর আগে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়! আপনার ছেলের হরবোলার ডাক প্রতিবছর খুব সাড়া ফেলে দেয়! এইবছর ও তাই........
- তা আমাকে কি করতে হবে মাষ্টার?... কথা শেষ করতে দেয়না লোকটি!
- খানিকটা দমে গেলাম! ওকে একটু ডেকে দিন না!
কথাটা শেষ না হতেই ময়লা ধুতি পরা দেহাতী বুড়ো টা কেমন যেন খ্যানখেনে গলায় হেসে উঠল! ভয়ে ভয়ে আড় চোখে তাখিয়ে দেখলাম খুঁটিতে বাঁধা ছাগলটাও আমার দিকে দাঁত বের করে জাবর কাটছে! হাসছে নাকি! গা জ্বলে গেল! তেড়ে জিজ্ঞেস করলুম
- কি হল? এত হাসছেন কেন?
- উ তো আর আসবেনি মাসটার!
- কেন আসবে না কেন? কি হয়েছে তার? আপনার মেয়ে কোথায়? তাকেও তো দেখছি না!
- অনেক দূর চলি গেছে! অনেক দূর!
চমকে উঠলাম শেষ কথাটা শুনে! চলি গেছে মানে! জিজ্ঞেস করলাম
- কোথায় গেছে?? কোন উত্তর পেলাম না! বুড়ো ততক্ষণে নেশার কোলে ঢলে পড়েছে!
তিতিবিরক্ত হয়ে বেড়িয়ে এলাম মাটির বাড়িটা থেকে! আমার ছাত্রটি এতক্ষণ দাওয়ায় বসে ঢুলছিল! আমার পায়ের শব্দ শুনেই ধড়মড় করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল
- কি হল স্যর? পলাশের খোঁজ পেলেন?
- সংখেপে বললাম না!
- কি হবে স্যর আমাদের ফাংশানের?
- জানিনা! চুপ করতো!
- ধমক খেয়ে ছাত্রটি গুম হয়ে গেল! আমি ধপ করে মাটির দাওয়ায় বসে আকাশপাতাল ভাবতে লাগলাম কি হল ওদের দুজনের?
- স্যর একটা কথা বলব? অনেক্ষণ পর ছাত্রটি নীরবতা ভঙ্গ করে বলে উঠল! স্যর! আকাশের অবস্থা ভাল নয়! চলুন এবার যাই! সন্ধের আগে ফিরতে হবে!
- ছেলেটির কথায় সম্বিৎ পেয়ে দেখি পুবের আকাশ কালো করে এসেছে! ছাত্রটিকে বললাম চল! তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ি! রাস্তায় যে কজন চাষাভুষো মানুষকে দেখলাম তারা কেউই পলাশ কে চেনেনা! একটু অবাক লাগল! পলাশের বাবার এই অদ্ভুত কথাবার্তা আর এই অদ্ভুত পরিবেশ সবটা মিলিয়ে কেমন যেন গা ছমছম করে উঠল!
ঘন বাঁশবনের পাশ দিয়ে রাস্তাটা বাঁদিকে ঘাটের দিকে এগিয়েছে! সে রাস্তাটা বরাবর এগোতেই ধারে কাছেই কোথাও একটা কান ফাটান বাজ পড়ল! আমি আর ছেলেটি চুপ করে একটা ঘন বাঁশঝাড়ের নীচে দাঁড়িয়ে পড়লাম! বাঁশঝাড়ের উপর তখন উন্মাদ নৃত্য শুরু হয়ে গিয়েছে! দু এক ফোঁটা বৃষ্টির জল আমাদের নাকে এসে লাগল! অন্ধকারের মধ্যে ছাত্রটি দেখি একদৃষ্টে সামনের দিকে চেয়ে আছে! ঠেলা মারতেই বলে উঠল
- সর্বনাশ করেছে স্যর! মনে হচ্ছে আমরা পথভোলা পেত্নীর খপ্পড়ে পরেছি! না হলে ঘাটের রাস্তা এখান থেকে কিছু দেখতে পাচ্ছি না কেন?? শেষটায় তার গলাটা কেঁপে গেল মনে হয়!
- বললাম পথভোলা পেত্নী আবার কি রে?
- স্যর আছে একজন স্যর! অচেনা কেউ এই গাঁয়ে এলে তাকে পথে ঘুরিয়েই মেরে ফেলে!
- আগে বলিসনি কেন হতভাগা? জানলে আমি আসতুম ই না এই অজ গাঁয়! ছাত্রটি কিছু না বলে এদিক ওদিক তাকাতে লাগল! আচমকা ওপরে তাকিয়ে হিস্টিরিয়া রোগীর মত কাঁপতে লাগল! ওর দেখাদেখি আমিও ওপরের দিকে তাকিয়ে যা দেখলাম রক্ত হিম হয়ে গেল আমার! দেখলাম ওপরের বাঁশঝাড়ের অন্ধকারের মধ্যে একটা সাদা শাড়ি পড়া মাঝবয়সী মেয়েলোক! চোখদুটি অস্বাভাবিক পাণ্ডুর বর্ণ! আমাদের কে দেখে যাচ্ছে! আমি একমূহুর্তে আর দাঁড়ালাম না! ছাত্রটিকে শুধু একটি বার বললাম দৌড়া! তারপর ই শুরু হল আমাদের দৌড় প্রতিযোগিতা! বলা বাহুল্য আমার ছাত্রটি এই কর্মে চ্যাম্পিয়ন! নিমেষে আমি তার থেকে অনেকটাই পিছিয়ে পড়লাম! জলকাদা ভেঙে দৌড়াতে গিয়ে একটা অদ্ভুত ফিলিং হল! মনে হল কে যেন মাথার উপর ঝুলছে! উপরে তাকিয়ে যা দেখলাম হাড় হিম হয়ে গেল আমার! এক অপার্থিব নারী শরীর আমার উপর শূন্যে প্রায় ঝুঁকে আছে! আমার আর কোন জ্ঞান নেই!
জ্ঞান যখন ফিরল তখন চারদিকে ঘুটঘুটে আঁধার! ছাত্রটির ও আশেপাশে দেখা পেলাম না! ঘন বাঁশ ঝাড়ের ভিতর থেকে ঝিঁঝিঁ র ডাক ভেসে আসছে! সারা শরীর আমার জলকাদায় মাখামাখি! উঠে দাঁড়ালাম! কিন্তু যাব কোনদিকে? পথ হারিয়ে বিদেশ বিভুঁইয়ে ব্যামভোলা হয়ে গেছি!মাথা কাজ করছেনা! মনে মনে আমার ছাত্রের আর ওই রামছাগল টার মুণ্ডপাত করছি আচমকা ঠিক তখনই পিছনের বাঁশবন থেকে রামছাগলের রাম চিৎকার ভেসে এল! শিউরে উঠলাম! ভুতের হাত থেকে ছাড়া পেয়েছি! ওই অলুক্ষুণে দাড়িয়ালা প্রাণীটির সাথে এঁটে উঠতে গেলে আমাকে উসেন বোল্ট হতে হবে যেটা সাত জন্মেও সম্ভব নয়! গুটি গুটি পায়ে শব্দটার কাছাকাছি যেতেই চরম বিস্ময়! দেখি পলাশ!!! দুর্যোগ কেটে যাবার পর আকাশে যেটুকু চাঁদ ছিল তারই আবছা আলোয় দেখলাম নরম একটা ঢিপির উপর সে আর তার বোনটি বসে আছে! রামছাগলের ডাকটি সেই নকল করছিল! কিরকম যেন রাগ হল! সারাদিন গোরুখোঁজা খুঁজলাম তখন বাবুর পাত্তা নেই আর এখন পথ হারিয়ে পরকালের চিন্তা করছি তখন বাবুর খেয়াল হল! হাঁক ছাড়লাম
- এই হতভাগা! এদিকে আয়! কোথায় ছিলি সারা দিন! দুই ভাইবোনের দেখা পর্যন্ত পেলাম না!
- আপনি চাইলেও আমি আসতে পারতাম না স্যর! গলায় যেন কেমন একটা বিষাদের সুর ঠেকল আমার কাছে! জিজ্ঞেস করলুম
- কেন রে! কি হয়েছে? তোদের মুখ চোখ এত শুকনো কেন!
- দাদার খুব ব্যথা করছে স্যর! বোন টা এতক্ষণ পরে বলে উঠল!
- কি হয়েছে! পড়ে টড়ে গেছিস নাকি! কোথায় লেগেছে দেখা!
- পায়ে স্যর! দেখলাম পলাশ বোনটিকে চিমটি কাটল! কিছু একটা যেন চেপে যেতে চাইছে ওরা!
- দেখি কোথায় লেগেছে!
- থাক না স্যর! আপনি আবার পায়ে হাত দিলে লজ্জা লাগে!
- মারব থাবড়া! পা দেখা! তোকে খুঁজতে এসে আমার হাড় ইষ্টক খাক হয়ে গেল! অগত্যা পাটা টেনে নিয়ে কোলের উপর রেখে দেখলাম গোড়ালির দুই ইঞ্চি উপরে দুটো সমদূরত্বে গভীর ফুটো! চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে সেখান থেকে! আমি বোনটি কে বললাম গাঁদাল পাতা নিয়ে আসতে! এই অজগাঁয় এর থেকে ভাল চিকিৎসে আর বোধকরি কিছু নেই! বোনটা একটু পরেই কোথা থেকে গাঁদাল পাতা নিয়ে আসল! আমি একটু ঘষে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিলাম! রক্ত পড়া তো বন্ধ হোক আগে!
- স্যর আপনি কি জন্য এসেছিলেন বললেন না তো?
- আমাদের স্কুলে ফাংশন এ তোকে লাগবে রে পাগল! হরবোলা র অনুষ্ঠান তোকে ছাড়া ভাবা যায়?
- সত্যি? কবে ফাংশন স্যর? পলাশের চোখে মুখে উৎসাহ!
- এই তো পুজোর আগেই! রিহার্সাল চলছে স্কুলে! তুই স্কুলে আয়!
- আসব স্যর তবে দিনের বেলায় আসতে পারব না! সমস্যা আছে! সন্ধে বেলায় আসব!
- সেকিরে! সাড়ে চারটেয় স্কুল ছুটি হয়ে যায়! তখন এলে হবে?
- না স্যর! প্লিজ স্যর! আপনি থাকলেই হবে! গলায় যেন আকুতি ঝড়ে পড়ছে!
- স্যর আমি আপনাদের স্কুলের নাম ডোবাব না! কাজ উদ্ধার করবই! যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া মুখখানি থেকে এরকম দৃঢ় বাক্য সত্যি খুব অবাক লাগল!
- স্যর আপনাকে এগিয়ে দিই! সোমনাথকে নিয়ে এসেছেন না সাথে? ভিতুর ডিম একটা! আপনার বিপদ দেখে পিঠটান দিয়েছে! আমি থাকলে আপনার কিছুই হত না স্যর!
- তুই খুব সাহসী হয়ে গেছিস এ কদিনে মনে হচ্ছে!
- এখন হয়েছি স্যর! দায়ে পড়ে!
পলাশের শেষ কথাটা আমার কানে কিরকম যেন ঠেকল! বললাম মানে? কি বলতে চাইছিস!
ঠিক তখনই ঘাটের দিক থেকে অনেক মানুষের কোলাহল শুনতে পেয়ে ধড়ে প্রাণ এল! সোমনাথ কে দেখতে পেলাম ভিড়ের মধ্যে! আমাকে দেকেই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল!
- স্যর কোথায় ছিলেন আপনি! অনেক কষ্টে এতগুলো লোককে জড়ো করতে পেরেছি! কোথায় ছিলেন আপনি!
- বাঁশবনের পাশে অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম! পলাশ আর তার বোন আমাকে উদ্ধার করে আমাকে ঘাট পর্যন্ত নিয়ে এসেছে!
- আপনি কাদের কথা বলছেন স্যর?
- এই তো! পলাশ! দেখাতে গিয়ে নিজেই বেকুব হয়ে গেলাম! কোথায় কে? খাঁ খাঁ করছে মাটির পোড়ো রাস্তা! দুজনে যেন ভাঙা চাঁদের আলোয় জোনাকির ঝাঁকের।মধ্যেই মিলিয়ে গেছে!
- স্যর আপনি চলে আসুন! আপনাকে ধরছি! আসুন!
- কোনরকমে টলতে টলতে নৌকায় উঠলাম! লোক গুলোর কাছে খবর পেলাম দিন সাতেক আগে পলাশ আর তার বোন সাপের কামড়ে মারা গেছে! তার বাবা ডাক্তারের কাছে না গিয়ে ঝাঁড়ফুক করেছিল অসহায় দুটি প্রাণকে! বাঁচাতে পারেনি! কলার ভেলায় দুই ভাইবোন কে ভাসিয়ে দিয়েছে! নদী আপন বেগে দুটি প্রাণ কে নিয়ে গেছে কোন অজানার উদ্দেশ্যে! চোখের জল আর বাঁধা মানল না! মা মরা দুটি শিশু এভাবে তাদের মায়ের কাছে যাত্রা করবে ঘুণাক্ষরেও ভাবি নি! নদীর জলে ভাঙা জোৎস্নার আলোয় দাঁড়ের আঘাত রাত্রির নিঃস্তব্ধতাকে খান খান করে দিচ্ছিল! দূর থেকে কোথাও রাত পেঁচার ডাক ভেসে আসছিল! সেদিকে তাকিয়ে বুক ভাঙা নিঃশ্বাস ফেলে বললাম ভাল থাক পলাশ! পরজন্মে যেন ভাল শিল্পী হয়ে জন্মাস!
পুনশ্চ - আমাদের স্কুলে ফাংশন খুব কৃতিত্বের সাথে পালন করা হয়েছিল! আর হ্যাঁ......পলাশ কথা রেখেছিল! কোলকাতা থেকে ভাড়া করে আনা এক হরবোলা শিল্পীর কন্ঠ রোধ করে নিজের কন্ঠই শেষবারের মত শুনিয়ে ইহলোক ত্যাগ করেছিল পলাশ......সমস্ত মায়ার বাঁধন কাটিয়ে! আর ফিরে আসেনি!
অরিন্দম @ নবপল্লী
Image may contain: sky, outdoor, nature and water

শুভদৃষ্টি


Image may contain: one or more people and closeup



# শুভদৃষ্টি

# কপিরাইট@অরিন্দম, নবপল্লী


ফোনটা একটানা বেজেই যাচ্ছে মিলনের! বেজে বেজে থেমে যাচ্ছে! আবার বাজছে! মিলনের কানে সে আওয়াজ ক্ষীণ স্বরে পৌঁছালেও ফোনের কাছে যাওয়ার উপায় নেই! ছাদের এককোণায় জলচৌকির উপর দাঁড়িয়ে সে তার চারপাশে মহিলাদের পরিক্রমণ সংখ্যা জরিপ করে চলেছিল! জেঠিমা পিসিমা খুড়িমা তাদের যত কন্যাবাহিনীর ঘেরাটোপে গলদঘর্ম মিলনের মন বার বারই ফোনের দিকে ছুটে যাচ্ছিল! সকাল থেকে বার পাঁচেক তিথির কল এসেছিল! প্রতিবারই সে কোন না কোন কাজে ব্যস্ত ছিল! পরে ফাঁকা পেয়ে সে যখন তিথিকে পালটা কল করল অপারেটর নিঃস্পৃহ কন্ঠে ফোন বন্ধ রাখার বার্তা ঘোষণা করল!! এবার ছয় নম্বর কল টাও বেজে যখন বন্ধ হয়ে গেল তখন দুনিয়ার হতাশা মিলন কে গ্রাস করল! রেগে গিয়ে বলে উঠল
- দুত্তোর নিকুচি করেছে এই বিয়ের! মেয়েটা সকাল থেকে খাওয়া না দাওয়া না, উপোস থেকে সমানে আমাকে ফোন করে যাচ্ছে তোমাদের জ্বালায় একটু ফোন ধরার জো নেই! কথাটা বলেই মিলন একটু বেকায়দায় পড়ে গেল! পাশ থেকে মাসতুতো বোন শতাব্দী বলে উঠল- বাবাগো! বিয়ের আগেই বৌদির উপর দাদার প্রেম একেবারে উথলে উঠেছে! পারিনা!
- গাট্টা খাবি কিন্তু উল্লুক! তুই দাঁড়ানা একঘণ্টা এই জলচৌকি র উপর! মেক আপ সব গলে নামবে! 
- ও মা আ আ! দেখো না দাদা মারবে বলছে!
- আঃ তোদের আজকের দিনেও ঝামেলা না করলে হয় না বুঝি?? মিলন! আরেকটু অপেক্ষা কর বাবা! হয়ে এসেছে! গায়ে হলুদ মাখানো হয়ে গেলেই জল ঢেলে তোর ছুটি!
- ও দিদি ছেলের আমার ঠাণ্ডা লেগে গেল! এবার গায়ে হলুদ টা দাও দিকি! পাশ থেকে পিসিমা তাড়া লাগায়!
অগত্যা মিলন কে এত গুলো প্রমীলা বাহিনীর আঙুলের অত্যাচার সহ্য করতে হয় বিনা বাক্যব্যয়ে!! হলুদ পর্ব সমাধা করে গায়ে একটু জল ঢেলেই মিলন ছোটে ফোনের কাছে! গা মোছাও তার কাছে পরিহাস মনে হয়! ফোনের কাছে আসতেই ঠিক তখনই আরেকবার ফোন বেজে ওঠে! কালবিলম্ব না করে ফোনটা কানের পাশে ধরতেই ওপাশ থেকে একটা অভিমানী রিনরিনে কণ্ঠস্বর বেজে উঠল- কি গো তুমি? আজকের দিনেও আমার ফোনটা ধরার সময় হয় না তোমার?? তুমি কি বোঝ না একটুও?!
- সরি সোনা! সকাল থেকে দম ফেলার সময় পাচ্ছি না! আমিও তোমাকে কতবার ফোন করলাম! পেলাম না! কোথায় ছিলে তিথি! মিলন তখন বন্যার বাঁধ সামলাতে ব্যস্ত! বড় অভিমানী মেয়ে তিথি! একটু অমনোযোগী হলেই আজকের এই শুভ দিনে চোখের জলে নাকের জলে ভাসিয়ে দেবে!
- আমি মেহেন্দি করছিলাম! তোমার গায়ে হলুদ হয়ে গেছে??তাড়াতাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা কর! আর খিদে সইতে পারছি না! কাল রাত থেকে না খাওয়া!
- তিথি আমার কথা শোন! খেয়ে নাও চুপি চুপি! কিছু হবে না! আমি বলছি!
- তুমি খেয়েছ?? 
- থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকে ফোন হাতে মিলন! চোখের সামনে বহুদিন আগের এক ঘটনা উন্মোচিত হতে থাকে!
সিটি কলেজ! প্রাঙ্গণে বহু ছেলেমেয়ের ভিড়! আজ কলেজের প্রথম দিন! মিলন দুরুদুরু বুকে ঢুকছে কলেজ প্রাঙ্গণে! চারদিকে কত রঙিন প্রজাপতিদের ভিড়! সকলেই নিজ নিজ গন্তব্যের পথে চলমান! এই দ্রুতগামী জীবনের মাঝখানে মিলন হঠাৎ নিজেকে খুব অসহায় বোধ করে! আর্টস নিয়ে ভর্তি হওয়াটা বাড়ির কেউ ভাল চোখে দেখেনি! অথচ মিলনকে এই বিষয়টা অন্ধের মত টানে! সে লেখালেখি করতেই বেশি ভালবাসে! বাড়িতে তাই নিয়ে ঝামেলা! রাগে অভিমানে সকালে কিছু না মুখে দিয়েই কলেজে চলে যায় মিলন! কিন্তু ক্যাম্পাসে পা দিয়েই অজানা এক আশংকার সঙ্গে পেট টাও কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে মিলনের! বোঝে খিদে পাচ্ছে তার! এদিক ওদিক তাকিয়ে কলেজ বিল্ডিং লাগোয়া একটি জলের কল নজরে পড়ে তার! বুভুক্ষু র মত সেই কলের নীচে মুখ দিয়ে জল খেতে যেতেই একটা জুঁই ফুলের মিষ্টি সুবাসের সাথে একটা নারীকন্ঠের কাতর নিষেধাজ্ঞা তার কানে ভেসে এল!
- উঁহু দাঁড়ান! খাবেন না!
আচমকা নারীকন্ঠে মিলন একটু থতমত খেয়ে গেল! আর ফোর্সে পড়া জলের ধারা তার জামার খানিকটা ভিজিয়েও দিল! রেগেমেগে নারীকন্ঠকে জবাব দিতেই পুরো থ হয়ে গেল মিলন! এ কাকে দেখছে সে?! লাল সালোয়ার পড়া এক তন্বী যুবতী তার সামনে দাঁড়িয়ে! কপালে এসে পড়েছে অবাধ্য কেশরাশি! পাতলা চেরিফলের মত ঠোঁটের উপর জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম! সবমিলিয়ে মেয়েটির নরম লাবণ্য মিলনকে স্তব্ধ করে দিল খানিকক্ষণ! 
- ঐ জল খেয়ে পেট খারাপ না করলেই নয় কি? 
- না মানে..... এই একটু! মিলন তোতলাতে থাকে!
- থাক! আর মানে বের করতে হবে না! এই নিন জলটুকু খেয়ে নিন! বলে সে ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে মিলন কে এগিয়ে দেয়! মিলন বোতলের জলটুকু এক নিঃশ্বাসে শেষ করে দেয়! পরক্ষণেই লজ্জা পেয়ে যায়! 
- এবাবা! আপনার জল তো শেষ করে দিলাম!
- তাতে কি হয়েছে! মা বলে দিয়েছে পথে ঘাটে কাউকে জলতেষ্টা পেয়েছে দেখলে নিজের বোতল দিয়ে দিতে! তাছাড়া ওই কলের জল কত নোংরা কে জানে? 
এক সাথে এত গুলো শব্দবাণ মিলনের কানে যেন মধু বর্ষণ করতে লাগল! কে এই মেয়ে? কোথা থেকে এসেছে? কত বসন্ত তো পার হয়ে গেছে! কত পুজোর রোশনাই এসেছে আর গেছে! কেউ তো তাকে এভাবে জল খাওয়ায় নি! কিসের পরীক্ষা নিচ্ছে বিধাতা? 
- আপনার নাম কি? 
আচমকা কোকিলকণ্ঠী র স্বরে চিন্তাজালে ছেদ ঘটে মিলনের! 
- আমি....ম...ম...মিলন!
- আচ্ছা আপনি তোতলা নাকি! হেসে গড়িয়ে পড়ে তন্বী! 
কিরকম যেন রাগ হয়ে যায় মিলনের! জল খাইয়েছে বলে যা ইচ্ছে তাই বলবে? 
- না আমি তোতলা নই! জল খাওয়ানোর জন্য থ্যাংকস! 
- বাবাহ! কি রাগ! মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে কিছুই খাওয়া হয়নি! যে ভাবে জল টা খেলেন?
হঠাৎ মিলনের খেয়াল হল মানিব্যাগ নিয়ে বেরোনো হয়নি! রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে গিয়েই মানিব্যাগ এর কথা বেমালুম ভুলে গেছে! 
আরো রেগে গিয়ে মিলন বলে উঠল
- আপনি কি করে জানলেন আমি খাইনি! আমি খেয়েছি! ক্লাসের দেরি হয়ে যাচ্ছে! চলি! আবারো ধন্যবাদ! জায়গাটা তাড়াতাড়ি পেরিয়ে যায় মিলন! যেতে যেতে পিছনে ফিরে দেখল তন্বীর মুখে আষাড়ের মেঘ! মনে তার অনুশোচনা জাগল! এভাবে না বললেও পারত মেয়েটাকে! বেচারিকে কলেজের প্রথম দিন কষ্ট দিলাম! যাক! পরে ক্ষমা চেয়ে নেব খন! 
ক্লাসে মিলনের লেকচারারের একটা বক্তব্য মাথায় ঢুকলো না! সারা ক্লাস ধরে তার চোখে অবাধ্য নরম চুলের গোছা গুলো খেলা করতে লাগল! আচ্ছা! মেয়েটার নাম তো জানা হয়নি! নিজের বোকামিতে নিজেরই গালে চড় মারতে ইচ্ছা করছিল! কোনমতে বাংলার ক্লাস টা কাটাল! মনটা ক্রমেই আজ অশান্ত হয়ে উঠেছে! তন্বী র সাথে আজ দেখা করতেই হবে আবার! বেয়াড়া খিদেটা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে! ক্যান্টিনের দিকে গুটি গুটি পা বাড়াল মিলন! মনে একরাশ লজ্জা আর অভিমান! ক্যান্টিন মালিক কে সে আজ বলবে যে তার পয়সা নেই?? তাও কলেজের প্রথম দিনে? ক্যান্টিনে পৌঁছে সে দেখে সব চেয়ার টেবিল দখল হয়ে গেছে! কলেজের সব ছেলে মেয়ে গুলো জটলা করছে! কোণের দিকে টেবিলে শুধু একজন বসে রয়েছে! মাথা ঝুকিয়ে ফোনে কার সাথে কথা বলছে যেন! বুকটা ধক করে উঠল মিলনের! তন্বী!! ভাল করে একটু আড়াল থেকে দেখে মিলন! মেদহীন ফর্সা শরীর! কপালে আবাধ্য চুলের গোছা মেয়েটি কে চারপাশের থেকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে! প্রতিমার মত মুখখানি! আচমকা মেয়েটি চোখ তুলে তাকাতেই মিলনের চোখাচোখি হয়ে যায়! লজ্জায় মিলন চোখ নামিয়েই জায়গাটা থেকে সরে আসে! গুটি গুটি পায়ে কলেজের পিছন দিকটায় চলে আসে! জায়গাটা অপেক্ষাকৃত নির্জন! একটা গাছের নীচের বেদিটায় ধপাস করে বসে পড়ে! মাথাটা কেমন যেন ঘুরছে! ঝাপসা চোখে দেখতে পেল বিল্ডিং লাগোয়া সেই জলের কলটিকে! টলমল পায়ে এগিয়ে কলটা খুলে দিতেই একটা নরম হাত কলশুদ্ধ তার হাতখানি ঘুরিয়ে বন্ধ করে দেয়! 
- তখনই জানতাম আবার আসবেন!
- আমি জল খাব সরে যান!
- খালি পেটে খেতে নেই জল!
- আমি যেমন করে খাই আপনার কি? মিলন যেন মরিয়া হয়ে ওঠে! তন্বী পাত্তা না দিয়ে জলের বোতল এগিয়ে দিতে দিতে বলে খেয়ে নাও! তোমার ব্যবস্থা করছি আমি! 
- মিলন আর কিছু না বলে জল টুকু গোগ্রাসে শেষ করে! 
- এসো আমার সঙ্গে! বেদীটায় বসবে চল! 
মিলনের হাতটা ধরে তন্বী বসিয়ে দিল! তারপর বলে উঠল 
- খেয়েছ? 
মিলন লক্ষ করে কখন আপনি টা তুমি হয়ে গেছে! মুখটা নামিয়ে বলে - না! 
ব্যাগ থেকে মেয়েটি টিফিন ক্যারিয়ার এগিয়ে দেয় মিলনের দিকে! 
- খেয়ে নাও! 
অবাক চোখে তাকাল মেয়েটির চোখে!
- তুমি খেয়েছ! 
দীঘির মত কালো চোখটিতে মিলন ক্রমশঃ হারিয়ে যেতে থাকে! কিসের একটা অপ্রতিরোধ্য টান সৃষ্টি করছে নিয়তি!? কে এই মেয়ে?? 
- তোমার নাম তো জানা হলনা আমার??
- মেয়েদের নাম জানতে নেই! বলেই রিনরিনে হাসিতে ভেঙে পড়ে তন্বী! 
- এই আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে! বাস ধরব! কাল কিন্তু মনে করে খাবার এনো! 
- চলো তোমাকে এগিয়ে দিই!
- না আজ না! কাল এসো! 
অবাক হয়ে গেল মিলন! কেন? আজ নয় কেন? 
- উফ! তোমার ধৈর্য এত কম কেন? পরে জানবে!
- আচ্ছা! সাবধানে যেও!
- তুমিও সাবধানে থেক!
মিলনের মস্তিষ্ক থেকে জুঁই ফুলের গন্ধ টা ক্রমে দূরে সরে যেতে থাকে! মিলন যেই পিছন ঘুরে যাওয়ার উদ্যোগ করছে আচমকা রিনরিনে কণ্ঠস্বর ভেসে এল খিলখিল হাসির সাথে!
- তিথি!! তিথি রায়! আসি!
- মিলন বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে থাকে তার যাওয়ার পথে! কত দিন পার হয়ে গেছে মিলনের এমন ভালবাসার জন্য! জুঁই ফুলের গন্ধের সুবাসের মতন কেউ তার জীবন কে এভাবে দমকা হাওয়ার স্রোতে ভাসিয়ে দিয়ে যায়নি! তিথি.......তন্বী.....লাল সালোয়ার.....অবাধ্য চুলের গোছা....সবটা মিলিয়ে কেমন যেন ঘোরের মধ্যে বাড়ি ফিরে এসেছিল মিলন!
- কি গো! কতক্ষণ চুপ করে থাকবে? বল! খেয়েছ তুমি?
- এতক্ষণ পরে তিথির ডাকে সম্বিৎ ফেরে মিলনের! 
- না গো! খাওয়া হয়নি! তোমার গায়ে হলুদের তত্ব টা পাঠিয়ে দিচ্ছি! সব মিটিয়ে আমাকে একটা ফোন কোরো! তুমি কিছু মুখে না তুললে আমার গলা দিয়ে নামবে না গো!আমার কলেজের প্রথম দিনের সেই মেয়েটা নিজে অভুক্ত থেকে আমাকে খাইয়েছিল! আমি এত পাষাণ নই গো তিথি!
ফোনের ওপার থেকে ফোঁপানির আওয়াজ শুনতে পায় মিলন! 
- তিথি তুমি কাঁদছ? আজকের এই শুভদিনে অন্তত ওই কাজটি কোরোনা প্লিজ! 
- তুমি আমাকে এত ভালবাস?
- এটা প্রশ্ন হল তিথি?
- মিলন! যদি এমন হয় আমি মরে যাই! তুমি আমাকে ভালবাসবে?
- তিথিই....ইইই! কি হচ্ছে কি? 
এবার মিলনের মনে হচ্ছে চোখ ফেটে জল নামবে!
- কি পাগলামি তিথি??! প্লিজ এসব বোলোনা!
- না গো না! আমি তোমার হাত থেকেই সিঁদুর নেব! নেবই! তোমাকে আমি বড় ভালবাসি মিলন! তোমাকে হারাতে চাইনা! 
- কে বলেছে তুমি হারাবে? কি হচ্ছে তিথি? কেন বলছ এসব?
- তুমি পঞ্জিকা বিশ্বাস কর?
- খুব একটা করি না! কেন?
- কন্যা রাশির ভাগ্য গণনা বলছে বিবাহে বিঘ্ন! আর উঁচু স্থান থেকে পড়ে গিয়ে প্রাণহানির সম্ভাবনা!
- যাহ! আগে ওই পঞ্জিকা ফেলো! যতসব বাজে বই! আর কখনো এরকম বলেছ তো দেখো আমি কি করি! 
- কি করবে? তিথির গলায় কপট দুষ্টুমি খেলা করে! 
- বুঝিয়ে দেব ফুলশয্যার রাতে! এখন শুধু দিন গোনো!
- ইস কি অসভ্য! এই মা ডাকছে! ফোনটা ছাড়ার আগে আমাকে ওই জিনিষ টা দাও!
মিলন জানে তিথি কোন জিনিষ টা চাইছে! আস্তে করে এদিকওদিক তাকিয়ে সে স্পীকারের উপরে একটা ভেজা চুমু খায়! বেশ খানিককাল উভয়ে চুপ থাকে! তারপর মিলনই নীরবতা ভাঙে
- তিথি!
- উঁ!
- চুপ কেন!
- এভাবে আমাকে চুমু খেলে কথা বলব কি করে? 
দুজনেই অতঃপর বাঁধভাঙা হাসিতে ভেঙে পড়ে! 
সময় ক্রমশ এগিয়ে যায়! নিয়তিও অলক্ষে জাল বোনে ভাগ্যের! মাঝে মাঝে মিলন ভাবে তিথির মত মেয়েকে পাওয়া শুধু গর্ব নয় সৌভাগ্যের ব্যাপার! কলেজের সবকটা মেয়ে তিথি কে হিংসা করত! কারণ টা আজ মিলন বোঝে! তিথির মত গুণ খুব কম মেয়ের আছে! সে শুধু ভালবাসতে জানেনা উজাড় করা ভালবাসা দিতেও জানে! প্রথমে দুই বাড়ির অমতে তিথি একগাদা ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে ফেলে! অনেক কষ্টে তাকে বাঁচান সম্ভব হয়! তারপর আর দ্বিতীয় কোন সম্ভাবনা খোলা রাখেনি মেয়ের মা বাবা! প্রথমে মিলনের বাবা রাজি না হলেও তিথিকে সামনাসামনি দেখে খুব পছন্দ হয়ে যায়! ইতিমধ্যে মিলন ও এস এস সি দিয়ে স্কুল শিক্ষকতায় নিযুক্ত হয়েছে! বিবাহের প্রাথমিক লক্ষণ গুলো সবই ফলপ্রসূ হলেও কেন জানিনা মিলনের মন আজ সকাল থেকেই অস্থির হয়ে আছে! কিছুতেই শান্তিতে থাকতে পারছেনা! সকাল থেকে বাম ভুরুটা নেচেই যাচ্ছে! আরেকটা অদ্ভুত জিনিষ সে সকাল থেকে লক্ষ্য করেছে! গলির মুখে কুকুর টা উপরের দিকে মুখ তুলে করুণ সুরে কেঁদে চলেছে! রাগ নেই.....রাগিণী নেই....ছন্দ নেই.......একটানা এই কান্নার সুরে মিলনের মন টা কেমন যেন ছটফট করে উঠল! অন্যমনস্ক ভাবেই হাতটা কপালে উঠে এল তার! মনে মনে বলে ওঠে
- ঠাকুর! আজকের দিন টা ভালোয় ভালোয় কাটিয়ে দাও! একবার মনে হল পঞ্জিকা টা খুলে দেখে তাতে মেষ রাশির কথা কি লেখা আছে? পরক্ষণেই হাসি পেয়ে গেল মিলনের! ধুর! এসব কি আবোলতাবোল ভাবছে সে! দোতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সে দেখতে পেল তত্বের গাড়িটা গলি ছাড়িয়ে বড় রাস্তায় উঠল! গাছের ফাঁক দিয়ে কোথাও একটা কাক অবিশ্রান্ত ডেকে চলেছে!! 


বিশাল বড় ছাদখানি! এ ছাদ বড় ভাল লাগে তিথির! প্রতি বিকেলে ছাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে অস্তগামী লাল সূর্যের দিকে চেয়ে কত কি ভাবে সে! লাল রশ্মি মেঘের মধ্যে দিয়ে তার নরম মুখটায় এসে পড়ত আর তিথি অবাক হয়ে যেত! বিশাল আকাশের তলায় মানুষের জীবন টা কত ক্ষুদ্র না? কত জীবনের আসা যাওয়া এই ক্ষুদ্র পৃথিবীতে! অথচ ঐ আগুনের গোলাটা নিষ্পলক ভাবে পৃথিবীর দিকে চেয়ে থাকে! কত কাল....?? কত যুগ??......তার ক্ষয় নেই.....বিলয় নেই.....তিথি অবাক হয়ে দেখে দ্রুতগামী নক্ষত্রের খসে পড়া! এই বুঝি এক নতুন প্রাণের জন্ম হল! সাথে সাথে সে কতবার চোখ বুজে মিলনের জন্য মানত করেছে! তিথি তার নরম বুকটার মধ্যে মিলনের জন্য ঢিপঢিপানি টের পায়!
- তিথি মা! সন্ধে হয়ে গেল! চলে আয় মা! কনে সাজানোর লোক এসে গিয়েছে!
আচমকা মহিলা কন্ঠে সম্বিৎ ফেরে তিথির!মিনতি পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে তিথির,
- যাই মা! আরেকটু! তুমি যাও! আরেকটু পরেই নেমে আসছি আমি!
মিনতি এগিয়ে এসে তিথির কপাল টা ধরে আলতো চুমু খেলেন! তিথির চোখে তখন জল! মুছিয়ে দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন
- মা রে! মেয়ের কাছে শ্বশুর বাড়িটাই সব! সব কিছু নিজের মনে করে মানিয়ে নিবি! কখনো যদি মনে কষ্ট পাস......
কথা শেষ হয় না! তিথি মা কে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠে
- মাগো! অজান্তে তোমাদের মনে খুব কষ্ট দিয়েছি গো! কিন্তু বিশ্বাস করো ওকে আমি দূর করতে পারতাম না মা! কিছুতেই না!
- চুপ পাগলি! আজকের দিনে আর ওসব কথা না! আয় নীচে নেমে আয়! কনে সাজানোর মেয়ে এসে গিয়েছে! অপেক্ষা করছে! বলে মহিলা শাড়ির আঁচলের খুঁটে চোখ মুছে তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গেলেন! তিথি চোখ মুছে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে গিয়েই ব্যাপারটা নজরে পড়ল! পোষা ময়নাটা জলের ট্যাংকের দেওয়ালে ঝোলানো খাঁচায় অস্বাভাবিকরকম ছটফট করছে! কোনদিন কিন্তু করেনা এরকম! ঠিক করল পাখিটাকে মুক্তি দিয়ে যাবে আজ! ওড়নাটা কোমরের সাথে কষে বাঁধল! একটা পা জলের পাইপে রেখে ভর দিয়ে উঠতে গিয়েই অনুভব করল পা টা পিছলে যাচ্ছে! পাটা সাবধানে নামিয়ে নিল তিথি! নরম বুকটা হাপরের মত ওঠা নামা করছে! কপালের উপর জমছে বিন্দু বিন্দু ঘাম! তিথি দ্বিতীয় বারের চেষ্টায় রত হল! ময়নাটা গলা দিয়ে তীক্ষ্ণ চিৎকার শুরু করে দিয়েছে ততক্ষণে! সাবধানে পাটা পাইপের উপর রেখে বাঁহাত দিয়ে ট্যাঙ্কের সাইডটা ধরে ফেলেছে তিথি! নিঃশ্বাস বন্ধ করে যখন পুরো ভর দিয়ে ট্যাঙ্কের উপর উঠল একঝলক ঠান্ডা হাওয়ার স্রোত তিথিকে বুলিয়ে গেল! স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ময়নার খাঁচাটাকে হাতে নিয়ে দরজা খুলে দিল! কিন্তু প্রতিদিনের অভ্যস্ত পাখি তার চিরচেনা বাসা ছেড়ে একচুল ও নড়ল না! হাতে করে সন্তর্পণে ময়নাটাকে বাইরে বের করে আনে! নীচের দিকে তাকাতেই মাথা ঘুরে উঠল তিথির! অত উপর থেকে নীচে সিমেন্টের বেসমেন্ট টাকে খুব অদ্ভুত লাগছে! দূরে রাস্তায় আস্তে লাইট জ্বলে উঠছে! নীচের থেকে সানাইয়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছে সে! ট্যাঙ্কির উপরের চাতাল টা পিছল হয়ে গেছে গতদিনের বৃষ্টিতে! পাখিটার চকমকে চোখ দুটোকে দেখে ভারি মায়া হল তিথির! প্রতিদিন কলেজ থেকে ফিরে এই ময়নাটিই ছিল তার একমাত্র খেলার সাথি! ময়নাটির মাথায় আলতো করে চুমু খেল তিথি! একটু যেন কেঁপে উঠল পাখিটি! ফিসফিসিয়ে তিথি বলে উঠল 
- যা পাখি! তোকে মুক্ত করে দিয়ে গেলাম! দুই হাতের বন্দী ঘেরাটোপ থেকে মুক্ত করার জন্য ট্যাঙ্কের চাতালটির আরেকটু কিনারে সরে এসে পাখিটিকে মুক্ত আকাশে ভাসিয়ে দিল তিথি! পাখিটি তিথির মুখে ডানার হালকা ঝাপটা দিয়েই হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দিল! শরীরের ভারসাম্য যেন একটু কেঁপে গেল তার! ব্যালেন্স রাখতে গিয়ে পিছনের পা টা চাতালের বাইরে দিয়ে ফেলল সে! পাখি তখন অনেকদূর বেরিয়ে গেছে.....দূর আকাশে বিন্দু হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে ক্রমশঃ! এত ব্যস্ত কোলাহলের মধ্যে মৃদু ধপ শব্দটি কারুর কানে এসে পৌছালনা! শুধু মেহেন্দি মাখানো হাতটি একটু কেঁপেই চিরকালের মত নিথর হয়ে গেল! 

কোলাহল মুখর বাড়িটার সামনে একটা সাদা টয়োটা গাড়ি এসে দাঁড়াল! পাত্রীপক্ষের যারা ছিল তারা সবাই হৈ হৈ করে ছুটল বর দেখতে! বরণ করতে হবে যে! এই বাড়ির একমাত্র মেয়ের জামাই বলে কথা! কিন্তু মিনতির মনে একটা প্রবল অস্বস্তি দেখা দিল! মেয়েকে সেই কখন নামতে বলেছেন ছাদ থেকে....এখনো তো এলনা! কি করছে কি? শেষকালে লগ্নভ্রষ্টা হবে নাকি তাদের মেয়ে??
বীরেন বাবু ততক্ষণে বরপক্ষ সামলাতে ব্যস্ত! মিনতি ভাবল একবার যাই স্বামীর কাছে.....খুলে বলি সব ঘটনাটা! কিন্তু পরক্ষণেই সামলে নিলেন! বিয়েবাড়ি তে কথাটা জানাজানি হয়ে গেলে অলুক্ষুণে ব্যাপার ঘটবে! তার চেয়ে নিজেই ব্যাপারটা দেখে আসার জন্য সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালেন মিনতি! ছাদে গিয়ে দেখেন শূন্য ছাদ খাঁখাঁ করছে! তিথিকে কোথাও দেখতে পেলেন না তিনি! একদমকা হাওয়ার স্রোত মায়ের মনের ব্যাকুলতাকে আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিল!
- তিথিইইই! কোথায় তুই মা! আয়! দেরি হয়ে যাচ্ছে তো! 
ফাঁকা ছাদে কথাগুলি প্রতিধ্বনি হয়ে তার কাছেই ফিরে এল! কোথায় তার মেয়ে? আকাশে পূর্ণ চন্দ্র! দুধসাদা আলোতে গোটা ছাদ টা যেন স্নান করছে একা একা! অস্তিত্বহীন প্রেতের মতন ছাদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকেন মিনতি! 

নীচের ঘরে বসে বসে তখন মিলনের একজোড়া তৃষার্ত চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছে নিজের আশ্রয় কে! দুই এক বার জিজ্ঞাসাও করা হয়ে গিয়েছে তিথির ব্যাপারে! জবাবে ইয়ার্কি ঠাট্টা ছাড়া কিছুই পায়নি! নাহ! আর কিছু জিজ্ঞাসা করবে না সে! তিথি আসুক! অভিযোগ জানাবে সে! আসুক! এক এক লহমা মিলনের কাছে একেক বছর লাগছে যেন! ভুরুটা আবার এত কাঁপে কেন? নিকুচি করেছে! মেয়েটা এখনো এলনা........!!!

সারাবাড়ি আজ আলোর রোশনাইয়ে মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে! কিন্তু পিছন দিকটা অপেক্ষাকৃত অন্ধকার নির্জন! ওদিকে খুব একটা বেশি লোকের চলাচল নেই! সামনের গেটে বসানো দুটো বাবল মেশিন গুলো ফেনা ছড়িয়ে যাচ্ছে অনবরত! বাচ্চা গুলো সেগুলোকেই ধরবার জন্য অবিশ্রান্ত দৌড়ে যাচ্ছে! মাঝে বড়দের বকাঝকাও জুটে যাচ্ছে কপালে! আচমকা বাগানের দিক থেকে এক ঠান্ডা বাতাসের স্রোত বাড়ির পিছন দিকটায় বয়ে গেল! তারপরই গোটা বাড়ি ডুবে গেল অন্ধকারের সমুদ্রে! লোডশেডিং....! জেনারেটর দুটো ভট ভট শব্দ করেই বন্ধ হয়ে গেল! চলল না! বাড়ির ভিতর থেকে সবার একটা মিশ্রিত গুনগুন শব্দ উঠতে লাগল এখানে সেখানে! বাড়ির ভিতর তখন চাঁদের আলো ধুইয়ে দিচ্ছে! মিলন কে বসিয়ে রেখে বন্ধুরা বাইরে বেরিয়ে দেখতে গেল ব্যাপারটা! মিলন ঘরে একা! মনের অস্থিরতা টা আরো কয়েকমাত্রা বেড়ে গেল! ধুতি টোপর সামলে বসার ঘর থেকে বেরিয়ে এল! বাড়ির ভিতর আবছা কিছু নজরে এল! মানুষগুলো সব বাইরে জটলা করছে! এক মিশ্রিত কোলাহল মিলনের কানে আসছে! চাঁদের আলো আংশিক এসে পড়েছে ছাদনাতলায়! যজ্ঞের আগুন তখনো ধিকি ধিকি জ্বলছে! আবছা অন্ধকারে মিলন দেখল ছাদনাতলায় কনের আসনে কে যেন বসে আছে! মাথার অংশটুকু চেলি দিয়ে ঢাকা! বুকটা ধক করে উঠল তিথি নয়তো? হ্যাঁ! তিথিই তো! কিন্তু ওখানে ওভাবে বসে আছে কেন? মিলন একপা একপা করে এগিয়ে গেল নারীমূর্তি র দিকে
- এই পাগলি! এখানে কখন থেকে আছ? আমাকে ডাকতে পারলে না?
- এই তো এখুনি এলাম! কারেন্ট টা চলে গেল কিরকম দেখলে? 
- হে হে! বিধাতাও চায় বুঝলে অন্ধকারে আমাদের বিয়ে টা হোক!
- বাজে কথা রাখতো! খেয়েছ কিছু?
- হ্যা খেলাম তো! ঢোকার মুখে রসগোল্লা দিয়ে বরণ করল না? হে হে
- আবার ইয়ার্কি? দাঁড়াও বাপিকে বলে দেব!
- নালিশ করে বালিশ পাবে ভেবেছ? তুমি তো এখন আমার !
- এখনো তো হইনি! বলেই রহস্যময় হাসি হাসল তিথি! সেই রিনরিনে হাসি! মিলন বিহ্বল হয়ে গেল!
- আচ্ছা মিলন আমি একটা জিনিষ চাইছি দেবে কি?
- বলেই দেখনা!
- এই নাও! বলে তিথি একটা সিঁদুরদানি এগিয়ে দেয় মিলনের হাতে! নাও! এই সিঁদুর আমার নাক থেকে সিঁথি পর্যন্ত পড়িয়ে দাও! তাড়াতাড়ি!
- এখনই!! এই অন্ধকারে? তোমার কি হয়েছে তিথি আজ?
- খুব মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে! প্লিজ মিলন! প্লিজ দাও!! শেষবার একটু আপন করে পেতে দাও তোমাকে!
- এরকম বোলোনা গো! খুব কষ্ট লাগে একথা শুনলে! এসো কাছে এস! দিচ্ছি! 
তিথি মিলনের কোল ঘেঁসে এল! মিলন আর দেরি না করে তার স্বামীত্বের পরিচয় টুকু তিথির মাথায় উপুড় করে দিল! তিথি মিলনকে সামলাতে সময় দিলনা! সঙ্গে সঙ্গে মিলনের বুকে মুখ রেখে ডুকরে কেঁদে উঠল! 
- মিলন খালি পেটে থেকনা প্লিজ! খাবার খেয়ে নিও! আর রাস্তাঘাটের জল খেও না গো! 
- না খাবনা! প্লিজ কান্না থামাও পাগলি! তিথিকে আরো জোরে বুকে আঁকড়ে ধরে মিলন! একটা দমকা বাতাস ঘরের মধ্যে থেকে বাগানের দিকে ধেয়ে যায়! আর ঠিক তখনই ভটভট শব্দে জেনারেটর চালু হবার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির পিছন দিকটা থেকে বহু মানুষের কোলাহল মিশ্রিত আর্তনাদ ভেসে আসতে থাকে! মিলন হতভম্ব হয়ে দ্যাখে তিথি নেই তার বুকে! কোলাহল ক্রমে কান্নায় পরিণত হয়! মিলনের বুকটা ধধকধক করতে থাকে! টলমল পায়ে পিছন দিকের সিমেন্টের বেসমেন্টের দিকে এগোতেই দেখে অনেক মানুষের জটলা! মেঝেতে কাকে যেন শোয়ানো আছে! চারদিকে রক্তের আলপনা! বীরেন বাবুকে দেখতে পেল মাটিতে শোয়ানো শরীর টা কোলে নিয়ে পাথর হয়ে বসে আছেন! চোখদুটো ক্রমে ঝাপসা হয়ে আসছে মিলনের! এও কি করে সম্ভব? তিথিকে তো নিজের হাতে সিঁদুর পরিয়েছে সে! সে এখানে এল কি করে! কি পরম নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে মেয়েটি! কি সুন্দর লাগছে তার তিথিকে! আস্তে আস্তে বসে পড়ল তিথির মাথার পাশে! বীরেন বাবুর হাত থেকে ধীরে ধীরে মাথাটা নিজের কোলে নিয়ে নিল!
- দেখো তিথি! চোখ খোলো! আমাদের শুভ দৃষ্টি হয়ে গেছে সোনা! আর ঘুমিও না! আমি আর কখনো রাস্তার জল খাবনা! দেখো! ওঠো তিথি! 
জীবন মরণের সীমানা অতিক্রান্ত সে শরীর ভালবাসার এমন ব্যাকুল আহ্বানেও সাড়া দেয় না! মিলন অবাক হয়ে দেখে তিথির নাক থেকে সিঁথি পর্যন্ত লম্বা সিঁদুরের রেখা রক্তের সাথে চুঁইয়ে পড়ছে! সানাই তখনো বিলাপ করে যাচ্ছে নব রাগিণী তে!......আকাশে তখন পূর্ণ চন্দ্র.......!!  
                                                                              Image may contain: 2 people, stripes and closeup


কায়াহীনের কাহিনী

অরিন্দম



বউ এর জেদাজিদি তে বাধ্য হয়ে লোন তুলে বাড়িটা কিনেই ফেললাম একপ্রকার!মিথ্যে বলব না! শহরের যান্ত্রিক জীবনে নিজেও ক্রমশ হাঁফিয়ে উঠেছিলাম! বসবাস করছিলাম ফ্ল্যাটে! জীবনের স্বাদ সেখানে কেমন সেটা বলাই বাহুল্য! এতটুকু স্বাধীনতা বলে কিছু নেই! জোরে গান শোনা যাবে না! বউএর সাথে উঁচু গলায় কথা বলা যাবেনা! পাশের ফ্ল্যাটের দত্ত বাবু আবার হার্টের পেশেন্ট!!! সেদিন
ফ্ল্যাটে সদ্য কেনা বুম বক
্স টায় উচ্চ মার্গে রবি ঠাকুরকে স্মরণ করছি😂 আচমকা পাশের বাড়ি থেকে কাজের মেয়েটি বলে গেল - দাদা আস্তে শুনুন! দাদাবাবুর ঘাম হতিছে!
আরে ঘাম হোক! চুলকানি হোক! ফোঁড়া হোক! তাই বলে এভাবে....??? নাঃ! এভাবে আর চলেনা!
সেদিন রাতে প্রিয়তমার সাথে একটু দুষ্টুমি চলছিল অমনি কলিং বেল! খুলে দেখি দত্ত গিন্নী! হাসি লাজুক মুখ করে বলল - কিছু মনে করবেন না! আমার কত্তা আবার হার্টের পেশেন্ট তো! কোনরকম উত্তেজনাই ওনার পক্ষে সহ্য হয় না! কাজেই....!!! উনি চলে গেলে খানিকক্ষণ গুম মেরে দাঁড়িয়ে রইলাম! বিছানায় এসে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লাম! ঘুম আর প্রেম দুই ই গেল! বউ ও বোধ করি ব্যাপারটা বুঝেছিল!! পরদিন সকালে উঠেই বেয়ারা আব্দার বউ এর
- শোনো! এই ফ্ল্যাটে আর থাকব না! অন্য কোথাও নিরিবিলিতে বাড়ি নাও! দুজনেই সার্ভিস করি! লোন পেতে অসুবিধা হবে না!
- আবার এত গুলো টাকার ধাক্কা! কি করে......কথা শেষ করতে দেয় না আমার মেয়ে! পাশে শুয়ে আদুরে হাতে আমার গলাটা জড়িয়ে ধরে বলে - ও বাপি! প্লিজ মায়ের কথা মেনে নাও না! আমারো এখানে কেমন যেন দম আটকে আসে! প্লিজ বাপি প্লিজ....!!
- একদিকে মেয়ের আবদার আরেকদিকে গিন্নীর মান রাখতে অগত্যা লোন তুলে বন্ধু অখিল কে বললাম ভাই একটা জমি সহ বাড়ি দেখ! নেব!
- এহেন প্রস্তাবের জন্য বন্ধুবর বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিল না! শুনে আকাশ থেকে পড়ল! সেকিরে ভাই! ফ্ল্যাট ছেড়ে দিবি?
- না ফ্ল্যাট থাকুক! তুই যেটা দেখতে বললাম সেটা দেখ! আজকেই দেখ! খবর না নিয়ে আসলে ডিভোর্স তোতে আমাতে!
- এ ত খুব সিরিয়াস কেস রে ভাই! দাঁড়া একটা ব্যাবস্থা করছি! বলে হন্তদন্ত হয়ে বেড়িয়ে গেল!
- চুল খাড়া করে ফিরল ঘন্টা দুয়েক পর! এসে বলল বৌদি জল দাও! মরে যাব আজ! যা গরম পড়েছে! বাড়ি খোঁজা কি মুখের কথা?
- যাত্রা বন্ধ করে আসল কথা বল! পেলি? আমার কথায় অখিল যেন একটু আহত হল মনে হল! বলে
- হ্যাঁ পেলাম বলে আমাকে পাত্তাই দিল না! বৌয়ের দিকে ফিরে শুরু করল
- হ্যা বোউদি যা বলছিলাম! দোতলা বাড়ি, সামনে বেশ কয়েকটা ফাঁকা জায়গা জুড়ে বাগান আর প্রচুর গাছ গাছালিতে ভর্তি! তুমি যেমন চেয়েছিলে তেমনটিই!
- বউ ভক্তিতে গদগদ হয়ে বলে উঠল সত্যি ঠাকুরপো তোমার এই বন্ধুটি একটা ঢ্যাঁড়শ! একটা বাড়ি বদলাবার কথা বলে আসছি এত কাল ধরে বাবু পাত্তাই দিল না!
- অখিল গ্যাস পেয়ে আমার দিকে আড় চোখে তাকিয়ে দেখল অবস্থা ভাল নয়! যেকোনো সময়ে পিঠে প্রহার আছড়ে পড়তে পারে! তাই তাড়াতাড়ি বলে উঠল নাহ! বোউদি আমি আসছি!ওদিকে আমার বউটাও পথ চেয়ে বসে আছে! বলে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আমাকে বলল আজ ই দেখা করে বুক করে আয়! পরে হাতবদল হয়ে যেতে পারে! আমি হাতের কিছু পাওয়া যায় কিনা খুঁজছিলাম! ও সেটা বুঝতে পেরেই দে দৌড়! বউ এর হাসিতে চটকা ভাংল! সত্যি তোমরা পার বটে দুই বন্ধুতে!
- অতঃপর বিকেলে তিনজনে সেজেগুজে বাড়ি দেখতে গেলাম! কাঁঠালিয়া বাসস্টপ এ যখন নামলাম সন্ধের আঁধার ঘনিয়ে এসেছে! আশেপাশের গাছগাছালির ফাঁক থেকে পাখিদের কিচিরমিচির আওয়াজ ভেসে আসছে! আমাদের বন্ধুবরের বলে দেওয়া ঠিকানায় যেতে যেতেই আরো ত্রিশ মিনিট লেগে গেল! যেরকম প্রত্যাশা করেছিলাম জায়গাটা তার থেকে বেশীই নির্জন! আচমকা ডান হাতে টান পড়তেই দেখি মেয়েও ভয়েতে আমার বগলের তলায় সেঁধিয়ে যাচ্ছে! বউ এর দিকে তাকিয়েও সাহস পাওয়ার মত কিছু দেখলাম না! দেখলাম প্রিয়তমা র চোখদুটো ভয়ে বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে উঠেছে! যাই হোক! মনে মনে বললাম নিরিবিলি চেয়েছিলে না! বেশ হয়েছে!! কিন্তু সাথে আমিও তো ফাঁসলাম! আধভাঙা গেট টাকে সরাতেই বিশ্রী ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ করে পুরোটাই খুলে গেল! ভিতরটা বেশ পরিষ্কার......বেশ বাগান বাগান লাগল! অনেক গাছ গাছালিতে ভর্তি! ভিতর দিয়ে অল্প উঁচু করে মোরাম বিছানো রাস্তা! একটু দূরেই গোলাপি রঙের দোতলা বাড়িটা ভূতের মত দাঁড়িয়ে আছে! আর তার ঢালু বারান্দায় হ্যারিকেন হাতে আর অমায়িক হাসি মুখে এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে! আমাদের দেখেই অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে এল! নমস্কার প্রতি নমস্কারের পালা শেষ হবার পর জানতে পারলাম মালিকের নাম অঘোর চন্দ্র রাউত! তার তেজারতি র কারবার ছাড়াও আরো দুই জায়গায় বাড়ী আছে! থাকেন ত্রিবেণী তে! এই বাড়ী কেন ছেড়ে দিলেন বিক্রি র জন্য সে কথা শুধাতেই ভদ্রলোক কিরকম যেন গম্ভীর হয়ে গেলেন! গোমড়ামুখে বললেন "আসুন ভিতরে ঘরগুলো দেখাই, আমাকে আবার তাড়াতাড়ি এই জায়গা থেকে বেরোতে হবে"! শেষ কথাটায় কিরকম যেন একটা খটকা লাগল! যাই হোক সপরিবারে ভিতরে ঢুকে দেখি বেশ সাজানো গুছানো ছিমছাম! স্ত্রী র যেটা সবথেকে ভাল লাগল বাড়ির পিছন দিকে দরজাটা খুললেই শান বাঁধানো বড় কলতলা! পাশেই একটা মজে যাওয়া কুয়ো! ব্যাবহার হয় না বলে অঘোর বাবু জানালেন ওটা পাত দিয়ে ঢাকা দেওয়া আছে! আর যেটা সবথেকে অবাক লাগল কুয়োর পাশেই উঠে গেছে এক বিশাল পাকুড় গাছ! উপরে সেটা শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে গোটা বাড়িটিকে প্রহরীর মত ঘিরে রেখেছে!
- হেঁহে! বুঝলেন দাদা! এই বাড়িটার এইটাই বিশেষত্ব! অত্যাধিক গরমেও বাড়ির ভেতর টা খুব ঠাণ্ডা! আমি খেয়াল করলাম উনি বলার মাঝে মাঝেই পাকুড় গাছের উপরের ডালপালার দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টি মেলে দেখছেন! আর একটা আশ্চর্য ব্যাপার! বাকি গাছ গুলো থেকে অজস্র পাখির কিচিরমিচির ভেসে এলেও এই গাছটি অদ্ভুতরকম শান্ত! সব দেখেটেখে গিন্নী কে বললাম কই গো কিছু বল! পছন্দ হল কিনা কিছুই তো বললে না! হঠাৎ খেয়াল হল মেয়ে কই!!! আবিষ্কার করলাম মেয়ে কলতলায় দাঁড়িয়ে পাকুড় গাছটার দিকে চেয়ে একমনে কি দেখছে!চোখ দুটি যেন বিস্ফারিত হয়ে গেছে তার!! আমি হাঁক দিলাম- কিরে! কি দেখছিস! এদিকে আয়! আড় চোখে দেখলাম অঘোর বাবুর মুখেও একটা চাপা আতংক ফুটে উঠেছে আর বিড়বিড় করে কি যেন বলছে! একটু কান পেতে শুনলাম ভদ্রলোক হনুমান চালিশা বলে চলেছে! শুনে বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল! মেয়ে দৌড়ে আমার কাছে এসে বলল - জান বাপি আমি না গাছে স্পষ্ট দেখলাম কে যেন বসে আছে! অঘোরবাবু শোনামাত্র প্রসংগ ঘুরিয়ে বলল- তা এই বাড়ি পছন্দ হয়েছে তো? এগ্রিমেন্ট টা সেরে ফেলি বলুন! আমি বললাম কতটে ফিক্সড হলেন বলুন?
- আজ্ঞে পনেরো তে পাকা কথা! আমি যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না! এত কম দাম! লোন তো তার চেয়েও বেশি! আমি আর গিন্নী মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলাম! অঘোরবাবু আমাদের ইতস্তত অবস্থা দেখে বলেন- দাম একটু বেশি হয়ে গেল না? আচ্ছা বার ই দেবেন! হলপ করে বলছি এত কম দামে এত বড় বাগান বাড়ি আর কোথাও পাবেন না! বলার মাঝে লক্ষ করলাম তিনি আবারো কলতলার দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন! অবশেষে এগ্রিমেন্টে সই সাবুদ করে যখন বাগানের ভিতর দিয়ে মোরাম বিছানো রাস্তায় হাঁটছি তখনই ঘটল ঘটনাটা! কলতলা থেকে এক অদ্ভুত ঝপাং করে একটা আওয়াজ ভেসে এল! সাথে একটা বাচ্চার আর্ত কান্না! থমকে দাঁড়ালাম! কি হল ব্যাপারটা! অঘোরবাবু পিছনেই আসছিলেন! তিনিও আওয়াজ টা শুনেছিলেন বোধকরি! তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে বললেন শকুনের বাচ্চা কাঁদছে মশাই! এরকম আওয়াজ শুনলে রাতবিরেতে হামেশাই মানুষের বাচ্চার কান্নার আওয়াজ বলে ভ্রম হয়!
- আর ওই জলের আওয়াজ টা! মজা কুয়ো থেকে এল মনে হয়!
- না না ও কিছু নয়! ভুল হতে পারে! চলুন এগিয়ে দিয়ে আসি!
অতঃপর সেদিন রাতে বাড়ি ফেরার পর গিন্নীর প্রথম কথা শুনলাম - ওগো! বাড়িটা যেন কিরকম! সবকিছু ঠিক! কিন্তু কলতলাটা......!
- দেখো! যা পেয়েছ এর চেয়ে কম দামে কিছু পেতে না! বলে হঠাৎ মনে পড়ল মেয়ের সেই অদ্ভুত কথা! মেয়েকে তৎক্ষণাৎ ডেকে শুধালাম-হ্যারে! কি দেখেছিলি তুই গাছে?
- বাপি! আমি স্পষ্ট দেখলাম গাছে কেউ বসে আমাকে দেখছিল! বলার সময় লক্ষ করলাম মেয়ের গলার স্বরটা একটু কেঁপে গেল!
- যাঃ! হনুমান হবে হয়ত!
- না বাপি! লম্বা চুল ছিল! উড়ছিল হাওয়ায়!!
- কি যে বলিস না! ঘুমাতে যা! মেয়েকে তো পাঠিয়ে দিলাম! কিন্তু মনের কোথাও একটা কু ডাক ডাকছিল! জানিনা এর পরিণতি কি হবে!
- অবশেষে একটা শুভদিন দেখে জিনিষপত্র লোড করে নতুন বাড়িতে এলাম! সামনের বড় বাগানটাকে পরিষ্কার করতেই দু দিন লেগে গেল!! সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার বাগান পরিষ্কার করানোর লোক পেয়েও তাকে দিয়ে কিছুতেই কলতলা পরিষ্কার করাতে পারলাম না! চোখে মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট!!! এই ভয়ই দেখেছিলাম অঘোরবাবুর চোখে! মনটা কেন জানিনা কু ডেকে উঠল! ভয়ে ভয়ে কলতলাটার দিকে তাকালাম, দিনের উজ্বল আলোতে ও পাকুড় গাছের ছায়ায় কলতলাটা খাঁ খাঁ করছে! গিন্নী রান্নাঘরে কি একটা বসিয়েছে! মেয়েটা কোথায় জানি কি করছে! আমি লোকটিকে তার পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে আসছি আচমকা নজরে এল কলতলায় পাকুড় গাছটার নীচে কি একটা পড়ে আছে লাল মতন! গিয়ে হাতে নিয়ে দেখলাম একটা পুরোনো পুতুল! সুতো বেরিয়ে গেছে, একটা চোখ নেই! পায়ের অর্ধেক টাই ছেঁড়া! একটু অবাক হলাম! মেয়ের পুতুল খেলার বয়স।তো নেই! তাহলে কি গিন্নী??? যাহ্‌!!! তা কি করে হয়??? আমি রান্নাঘরে ঢুকে দেখি গিন্নী পিছন ফিরে কি একটা রান্না করছে! আমি শুধালাম কি গো? এই পুতুল টা এল কি করে এখানে? মস্করা করে বললাম তুমি খেল না কি? গিন্নীর কোন ভাবান্তর দেখা গেলনা! আমি রেগেমেগে ঘর থেকে বেরিয়ে ছাদে উঠতেই চিলেকোঠার দরজা ঠেলে গিন্নী নেমে এল! আমার শিঁড়দাড়া বেয়ে একটা হিম স্রোত নেমে গেল! তাহলে রান্নাঘরে কে! আমাকে ভূতের মত দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে গিন্নী মারল ঠেলা!
- হাঁ করে কি দেখছ!
- তুমি ছাদে ছিলে?
- হ্যাঁ
- তাহলে রান্নাঘরে কে?
- আমি ছাড়া এখানে কে থাকবে! কি সব ভুলভাল বকছ?
- বুঝতে পারলাম কিছু একটা অমঙ্গল হতে চলেছে! তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম মেয়ে কোথায়???
- মেয়ে তো বাগানে! দোলনায় দোল খাচ্ছে!
আমি তাড়াতাড়ি গিয়ে দেখলাম বাগানের উত্তর পশ্চিম কোণে একটা দোলনায় মেয়ে আপন মনে বসে আছে! আরেকটা ব্যাপার লক্ষ করে শিড়দাঁড়া বেয়ে হিমেল স্রোত নেমে গেল! দোলনাটা আপনমনে দুলছে! মনে হচ্ছে পিছন থেকে কেউ যেন ঠেলে দিচ্ছে তাকে!! আতংকে চিৎকার করে উঠলাম! তিতলি উঠে আয় বলছি! অমনি দোলনাটা থেমে গিয়ে মাথার উপরে যত গাছ গাছালি ছিল আলোড়ন হতে লাগল! আচমকা ঘরের ভিতর থেকে বউ এর আর্ত চিৎকার ভেসে আসল! মরণ আর্তনাদ যেন! আমি মেয়েকে কোলে করে নিয়েই ছুট ঘরের দিকে! গিয়ে দেখি বউ কলতলার দিকে স্তম্ভিতের মত আঙুল তুলে দাঁড়িয়ে আছে! যেন কিছু দেখাতে চাইছে! আমি চারদিকে চেয়ে কিছু দেখতে পেলাম না! দুই ঘন্টা পর বউ একটু ধাতস্থ হবার যা জানা গেল তা সত্যি ভয়াবহ! বউ রান্নাঘরে খুন্তি নাড়তে নাড়তে টের পাচ্ছিল চিলেকোঠা থেকে কে যেন ধীর পদে নেমে যাচ্ছে সিঁড়ি দিয়ে! ভাল করে তাকিয়ে দেখল একটা মাঝ বয়সী মেয়েছেলে গায়ে ছেঁড়া কাপড় মুখটা নীচের দিকে নামানো আর সারামুখ অবিন্যস্ত চুলে ঢাকা! বাঁ হাতে একটা সাত আট বছরের মেয়ে হাত ধরে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে কলতলায় কুয়োটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে! বাচ্চাটার নাক দিয়ে ক্রমাগত টুপ টাপ করে ঝরে পড়ছে! রক্তের ফোঁটা!!
আমার কাছে ধীরে ধীরে গোটা ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল! কেন অঘোরবাবুর চোখ মুখ ভয়ে পাংশু হয়ে গেছিল,কেনই বা তিনি এত দাম কমালেন,আর কেনই বা লোকটা কলতলা পরিষ্কার করতে চায়নি! আর এক মূহুর্ত এখানে থাকা চলেনা! বউকে বললাম তাড়াতাড়ি জিনিষ গুছিয়ে নাও বেরিয়ে চল এখান থেকে!
জিনিষ পত্র গুছাতে লাগলাম চাপা আতংকের সাথে! মনে থেকে থেকে একটা প্রশ্ন কেবলই ধাক্কা দিতে লাগল অঘোর বাবু কি এসব কিছুই জানতেন না? নাকি জানতেন বলেই এত কম দামে বাগান বাড়ি টা বিক্রি করে দিলেন? ওই মহিলার সাথে বাচ্চাটার রহস্য কি? কেন তারা বার বার দেখা দিচ্ছে? শেষ কথাটি মনে আসার সঙ্গে সঙ্গে গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল!!
ওরা যে কায়াহীন সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই! কিন্তু ওরা এখন পর্যন্ত আমার বা পরিবারের কারুর অনিষ্ট করেনি বা করতে চায়নি! তাহলে বারবার তাদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে কেন? কুয়োটার সাথে এসবের কি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়ে গেছে কোথাও! এসব ভাবছি আচমকা বউ এর আর্তনাদ ভেসে এল ডাইনিং রুম থেকে! তাড়াতাড়ি গিয়ে দেখি মেয়ে আর গিন্নী দোতলার সিঁড়ির দিকে পান্ডুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে! আমি কথা বলতে গেলেই গিন্নী আমার হাত চেপে ধরে চুপ করার ইশারা করল! আর উপরের ঘরের দিকে আঙুল তুলে কি একটা দেখাতে চাইছে! মুখ তুলে যা দেখলাম রক্ত হিম হয়ে গেল!!
দেখলাম দোতলার করিডোর এর লাইট টা জ্বলছে আর নিভছে! আর দোতলা থেকে মেয়ের খেলার ফুটবল টা আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে নামছে! গড়িয়ে নামা নয়! রীতিমত লাফিয়ে লাফিয়ে! মনে হয় কেউ বলটাকে ভলিবলের মত ড্রপ খাওয়াতে খাওয়াতে নামিয়ে আনছে! মেয়েকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরলাম! বলটা ঠিক এসে আমাদের পায়ের কাছে থেমে গেল! পাশে গিন্নী রীতিমত থকথক করে কাঁপছে! আমি আস্তে করে বলটাকে হাতে তুলে নিলাম! বুকটা ঢিপঢিপ করছে! আচমকা আমার মনে কি একটা বুদ্ধি খেলে গেল! মেয়েকে বলটা দিয়ে বললাম তুই ছুঁড়ে মার দেখি বলটা দোতলায়! মেয়ে দেখি ভয়ে বড় বড় চোখ করে বলল কি বলছ বাপি?
- আরে ছোঁড় না!
- মেয়ে বলটা ছুঁড়তেই অবাক কান্ড! সেটি আবার আগের মতন সিঁড়ি দিয়ে লাফিয়ে নামতে লাগল! আমার মুখে একটা হাসির ঝিলিক খেলে গেল! গিন্নী কে বললাম জিনিষপত্র যা বের করেছিলে গুছিয়ে রাখ! এই বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার দরকার নেই! গিন্নীর অবস্থা তথৈবচ! আমি অবস্থাটা সামলে বললাম আমাকে বিশ্বাস রাখ! কারুর কিছু হবেনা! বলে দোতলার দিকে মুখ করে বলে উঠলাম
- দিদি! ভাইয়ের মত বলছি আমরা তোমার কোন ক্ষতি চাইনা! কিন্তু প্লিজ আমাদের কোন ক্ষতি কোরনা!! একটা জিনিষ বুঝতে পারছি কিছু একটা বলতে চাইছ! প্লিজ সামনে এসে বল! ভাই হয়ে যদি কিছু করতে পারি!
- বলার সাথে লক্ষ করলাম দোতলার লাইট টার জ্বলা নেভা কমে গিয়ে কলতলার পাকুড় গাছটায় প্রচন্ড আলোড়ন শুরু হল! রান্নাঘরের দরজা দুমদাম শব্দে একবার খুলতে আরেকবার বন্ধ হতে লাগল! কানে এল সেই পরিচিত পায়ের আওয়াজ! দেখলাম এক অস্পষ্ট নারীমূর্তি হাতে একটি বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে প্রবেশ করল ঘরে! ঠিক সেই সময়ে ঘরের ভোল্টেজ টাও ডাউন হয়ে এক অদ্ভুত আলো আধারির খেলা চলছিল! স্পষ্ট দেখলাম নারীমূর্তি টি আমার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে! একটা অদ্ভুত ফ্যাঁসফেসে গলায় বলল- ভয় পেয়োনা গো! আমার খুব কষ্ট! আমার মেয়েটাকে ও নির্মম ভাবে মেরে ফেলেছে! আমি শুধু অসহায়ের মত চেয়ে দেখেছি! কিছু করতে পারিনি!
- আমি বোবা গলায় বলতে চেষ্টা করলাম তোমার মেয়েকে কে মেরেছে দিদি?
- একটা ফ্যাঁসফেঁসে গলায় যে নামটা ভেসে এল সেটার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না আমি! নামটা পরিষ্কার শুনলাম
- অ--ঘো---র!!!!!! আমার সামনে গোটা দুনিয়া টা দুলে উঠল! অঘোর বাবু!!! জমির মালিক??????
- ছায়ামূর্তি টি তার মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে শুরু করল তার দুঃখ ভরা জীবনের ইতিহাস! সে জন্মসূত্রে ওপার বাংলার মেয়ে! পেটের টানে তার এখানে আসা! ঘটনাসূত্রে তার অঘোরের সাথে আলাপ! লোকটা তার শরীরে উপর প্রথম থেকেই আসক্ত ছিল! নানা ছলে বলে কৌশলে তার কাছে ঘেঁষার চেষ্টা করত! কিন্তু সে তার এই বাগান বাড়িতে দেখাশোনার কাজে নিযুক্ত হয়েছিল! সেটা ছেড়ে অন্য কাজ দেখাও ছিল দুষ্কর! একদিন সুযোগ পেয়ে অঘোর তার সাথে জোর করে মিলিত হয়!
- কথাগুলো বলার মাঝখানে লক্ষ করলাম তার গলার স্বর একটু কেঁপে গেল!আমি জিজ্ঞাসা করলাম তারপর??
- একটু থেমে আবার শুরু করল
- শয়তান টা আমার গর্ভে সন্তানের জন্ম দিয়েও একদিনের জন্যও তার পাশবিক অত্যাচার বন্ধ রাখেনি! অনেক কষ্টে মেয়েকে ওর মারের হাত থেকে বাঁচাতাম! মেয়েটা আমার দুধ খেতে চাইলে দিতনা! জোর করে ঘরে বন্ধ করে রাখত! কতবার মেয়ে খিদেতে কেঁদে উঠত! বলত মা খাব খিদে লেগেছে! ওই শয়তানের মন গলেনি! লাথি মারত ওর নরম শরীর টাকে! একদিন এরকম ই খিদের চোটে খুব কাঁদছিল! অঘোর শয়তান টা এসে সবার আগে কলতলায় মেয়ের ছোট্ট শরীর টাকে টানতে টানতে নিয়ে যায়! তারপর নরম ছোট্ট তলপেটে এক লাথি কষিয়ে দেয়!
- অসহায়ের মত দেখলাম আমার সোনার ছোট্ট শরীর মা-আ-আ ডাক ছেড়েই নেতিয়ে পড়ে! নাক দিয়ে বেয়ে পড়ছে আমার ই রক্ত! রক্ত বের করে দিয়েছে! মেরে দিল আমার কলজেটা কে! কিছু করতে পারলাম না! কিছু না! ছায়ামূর্তিটি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল!
- অসম্ভব নীরবতায় ছেয়ে গেল চারদিকে! আমি টের পেলাম আমার চোখ দুটো দিয়ে টপ টপ করে জল পড়ছে! আস্তে আস্তে বাচ্চাটার সামনে হাঁটু গেড়ে বসলাম! উস্কোখুস্কো চুল টা যেন স্পর্শ করতে পারছি মনে হল! আস্তে করে চুল গুলো মুখের সামনে থেকে সরিয়ে দিয়ে মুখটা দু হাতের মধ্যে নিয়ে একটু উঁচু করে আলো আঁধারিতে দেখলাম কি কচি মুখটা! কি নরম! আর নাকের পাশ দিয়ে টাটকা গড়িয়ে পড়ছে রক্তের ধারা! আমার বুকটা ফেটে গেল যেন! বললাম
- খাবি মা? খিদে পেয়েছে?
- বাচ্চাটি কিছু না বলে শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল! আমি তাড়াতাড়ি ফিরে গিন্নী কে কিছু বলতে যাব দেখি গিন্নী ফ্রিজ থেকে যত খাবার ছিল সব সাজিয়ে রাখছে মাটিতে! চোখ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল মাটি ভিজিয়ে দিচ্ছে! আমার বউ কাঁদছে! বুঝলাম ছায়া থেকে কায়া এই পরিসিরে মাতৃহৃদয়ের বিবর্তন হয় না! মা মা-ই থাকে! অদৃশ্য ভোজ বাজির মত মাটিতে রাখা খাবার গুলো নিমেষে অদৃশ্য হয়ে যায়! তারপরেই শোনা যায় কলতলায় জলের আওয়াজ! নিমেষে সব বাসন কোসন ঝক ঝকে রূপ নিয়ে রান্নাঘরের সঠিক জায়গায় সজ্জিত হয়ে যায়! ছায়ামূর্তিটি বলে আমি তোমাদের প্রথম দিন দেখেই বুঝেছিলাম তোমরা মানুষ খারাপ না! প্রতিশোধ নেবার জন্য দিন গুনছি! জানোয়ার টা আমার মেয়েকে মেরে ছোট্ট শরীরটা ওই কুয়োতে ফেলে দিয়েছে! ওখান থেকে উদ্ধার না করতে পারলে আমার মুক্তি নেই!
- শুনে আমার কিরকম যেন ঘোর লেগে গেল! বললাম দিদি ওই জানোয়ার কে আমি নিয়ে আসব! তোমার মেয়ের অন্তিম সৎকার আমি করব! এরকম জানোয়ারের বেঁচে থাকার অধিকার নেই! মূর্তিটি একটু হাসল! তারপর মেয়েকে নিয়ে আস্তে আস্তে পাকুড় গাছটার দিকে এগোতে এগোতে বলল- ও হ্যাঁ! এই অভাগিনীর নাম সরলা! নাম বলবে! চিনতে পেরে যাবে! বলার সাথে সাথে অদৃশ্য হয়ে যায় দুটি শরীর! আর কুয়োর ভিতর থেকে ভেসে আসে ঝপাং করে এক শব্দ! কায়াহীনের আবাস স্থল!!!!!
- পরের দিন সকালেই ফোন করলাম অঘোর বাবুকে! জানোয়ার টার গলার আওয়াজ শুনেই পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলে গেল! কিন্তু বুঝতে দেওয়া চলবে না! যতটা সম্ভব নিজেকে শান্ত রেখে বললাম এগ্রিমেন্টের একটা ব্যাপার নিয়ে কিছু বলার ছিল! আপনি সন্ধের দিকে আসুন না!
- শুনে কিরকম যেন থতমত গেয়ে গেল অঘোর চন্দ্র রাউত! বলল ইয়ে মানে সকালে গেলে হয় না?
- কেন কোন সমস্যা আছে নাকি?
- হ্যা মানে....না.....মানে ইয়ে....সকালে করা যায় না?
- না যায়না! কঠোর বাক্যে জানিয়ে দিলাম! আসতে হলে সন্ধে বেলাতেই আসতে হবে! আমার কাজ আছে এখন!তাই সকালে হবে না!
- আচ্ছা ঠিক আছে! আসবখন! কিন্তু তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিতে হবে! এতটা রাস্তা যেতে হবে ত!
- আচ্ছা আপনি এত তাড়ায় থাকেন কেন বলুন তো? সেদিন ও তাড়ায় ছিলেন! আজো এত তাড়া আপনার!
- না কিছুনা! আচ্ছা আপনাদের ওদিকে সব ঠিক তো! কোন অসুবিধা নেই ত?
- এবার একটু সাবধান হয়ে গেলাম! হারামী টা খেলছে বুঝলাম! বললাম না না কোন সমস্যা নেই! এত সুন্দর পরিবেশ ভাবাই যায় না!
- বলার সাথে সাথে পাকুড় গাছটার থেকে একটা চাপা খিল খিল হাসির আওয়াজ ভেসে এল!
- আচ্ছা কে হাসছে বলুন তো?হাসির আওয়াজ শুনলাম! অঘোরের কন্ঠে ভয়!
- ও কেউ না! আপনি আসুন! আমার কাজ আছে! সন্ধেবেলা দেখা হচ্ছে! বলে লাইন টা কেটে দিলাম!
- আড় চোখে বাগানের কোনায় চেয়ে মেয়ে দোলনায় বসে আছে! আর দোলনাটা আপনা আপনি হাওয়ায় দোল খাচ্ছে! বুঝলাম ছায়া আর কায়ায় খেলায় মেতেছে! এই খেলাই মরণ খেলায় বদলে যাবে আজ রাতে! পাকুড় গাছটার দিকে তাকালাম! দেখলাম কি একটা সড়াৎ করে উপরে উঠে গেল! কুয়োর কাছে গিয়ে দেখি ঢাকনিটা তালা দিয়ে বন্ধ করা আছে! রাগে আমার সর্ব শরীর কাঁপতে লাগল! আর কাল বিলম্ব না করে থানায় গিয়ে বড় বাবুকে সবিস্তারে সব বর্ণনা করলাম! শুনতে শুনতে বড় বাবুর চোখ বিস্ময়ে ঠিকড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছিল! ঠিক হল আসামীকে বেঁধে থানায় ফোন করলেই পাঁচ মিনিটের মধ্যেই দলবল নিয়ে হাজির হবেন! ফিরে গিন্নীকে বললাম ব্যাবস্থা হয়ে গিয়েছে! সবাই যেন তৈরি থাকে! বলার সাথে সাথে টের পেলাম রান্নাঘরের দরজা টা সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল! বুঝলাম দিদি ও যা বোঝার বুঝে নিয়েছে! আজ রাতেই নাটকের যবনিকা পতন হবে!
সময় যত এগিয়ে আসতে লাগল ততই একটা চাপা টেনশন বাড়িটা কে আস্তে আস্তে গ্রাস করছিল! দূরের ঝোপঝাড়ের মধ্যে কি একটা চাপা আতংক থম মেরে আছে! গাছের পাতাগুলো ও আজ অদ্ভুত রকম ভাবে নির্বাক নিশ্চুপ!
অবশেষে বিকেল গড়িয়ে সন্ধের আঁধার ঘনিয়ে এল ভুতুড়ে বাড়িটাকে ঘিরে! বউ মেয়েকে আগে থেকে বলে দেওয়া ছিল তারা যেন বাইরের ঘরে থাকে! কোনরকম কিছু হলে দ্রুত বাইরে বেরোতে পারে! ভুলেও কলতলার ছায়া যেন না মাড়ায়!
আড়চোখে পাকুড় গাছ টার দিকে তাকিয়ে দেখলাম বড় বড় ডালপালা নিয়ে ঘন পাতার অরণ্যে বিভীষিকাময় চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে! আশেপাশে তাকিয়ে সরলাকে কোথাও দেখতে পেলাম না!
আচমকা কানে এল গেট খোলার আওয়াজ! মনটা অশান্ত হয়ে উঠল আচমকা! জানোয়ারের আবির্ভাব ঘটেছে! আচমকা পাকুড় গাছটায় ঠান্ডা হাওয়া খেলে গেল! বুঝলাম শিকারি বুঝেছে শিকার আসছে! স্বাভাবিক হয়ে বেরিয়ে দেখি অঘোর গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে! কিন্তু তার হাঁটার মধ্যে কেমন যেন সন্ত্রস্ত ভাব!
- আরে অঘোর বাবু যে! আসুন আসুন কথা আছে!
- বাগান টা তো অন্ধকার করে রেখেছেন মশাই! আলো লাগাননি কেন?
- সেকি মশাই! আপনি তো এতকাল এখানে ছিলেন! আজ অন্ধকার এত গায়ে লাগছে কেন?
- অঘোরের চোখ দুটো দেখলাম অন্ধকারেও হিংস্র জন্তুর মত জ্বলে উঠল!
- কি বলবেন তাড়াতাড়ি বলুন! আমাকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে!
- কোথায়?
- এই প্রশ্নের উত্তরে অঘোর চমকে উঠল! বলল মানে? বাড়ি যাব!
- কেন? এটা বাড়ি নয়? আমি বলতে বলতে শয়তানটার উপর আরো ঝুঁকে এলাম! আজ যেন কি হয়েছে আমার? কথা গুলো আমি নয় অন্য কেউ আমাকে দিয়ে বলাচ্ছে!
- একটু ক্ষুণ্ণ হয়ে অঘোর বলে কি বলবেন কাজের কথা বলুন?
- এগ্রিমেন্টে আপনি একটা বিষয় এড়িয়ে গেছেন!
- কথাটা শুনে এত অবাক হয়ে গেল শয়তান টা যে কথা বলতে বলতে কখন যে কলতলায় পৌঁছে গেছি খেয়াল করতে পারল না!
- কোন বিষয় টা বলুন তো?
- আচ্ছা সরলা কে?
- এই প্রশ্ন টার জন্য মনে হয় প্রস্তুত ছিল না তেজারতি কারবার করা মানুষ টা! হাঁ করে আমার দিকে চেয়ে রইল! চারদিকে অসম্ভব নিঃস্তব্ধতা! পাকুড় গাছটায় হাওয়া বাতাস লেগেছে মনে হল! স্পষ্ট দেখলাম অঘোর এর পিছন থেকে উঠে যাওয়া পাকুড় গাছটা থেকে আস্তে আস্তে এক জোড়া পা শুন্যে ভাসতে ভাসতে নামছে! অঘোর ভয়ার্ত কন্ঠে এক চিৎকার করে পালাতে গেল ঘরের দিকে! আমি এই সুযোগ টারই অপেক্ষায় ছিলাম, জানোয়ার টাকে মারলাম এক ধাক্কা! মাটিতে পড়ে যেতেই রান্নাঘরের দরজা বন্ধ করে দিলাম! শুনলাম কুয়োর পাতটা ঝন ঝন করে খোলার আওয়াজ! বউ আর মেয়েকে বললাম - চল! কাজ শেষ! রহস্যে ঘেরা বাড়িটা ছেড়ে যখন বেরিয়ে আসছি পিছন থেকে অমানুষিক যন্ত্রণাকাতর মানুষের মরণ আর্তনাদ ভেসে আসছে! পকেট থেকে মোবাইল বের করে থানায় ফোন করতে গিয়েও হাত টা থেমে গেল! গেটের কাছে দাঁড়িয়ে সেই বাচ্চা মেয়েটি! আশ্চর্য এখন আর ভয় করছে না! হাঁটু গেড়ে বসে ছায়ামূর্তিটিকে বুকে জড়িয়ে নিলাম! ছায়া কায়া আজ এই পিতৃ হৃদয়ে মিলে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে! মেয়েটি আস্তে আস্তে আমার বুকে মিলিয়ে গেল আমার চোখের জলে ভেজা গাল টা ছুঁয়ে!! পিছনে তখন আর্তনাদ থেমে গেছে! গোটা বাড়িটাকে আস্তে আস্তে গ্রাস করছে মৃত্যু নৈঃশব্দ্য! আচমকা দমকে আমার বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে এল! মেয়ের বুকে মুখ চেপে ডুকরে কেঁদে উঠলাম
- বিশ্বাস কর মা! তোর ব্যাথা লাগলে আমারো লাগে! ছায়া কায়া বুঝি না! আমি তো বাপ! তোকে আর কখনো বকবো না!.......কখনো না........!!!!!!!

ডাকটিকিট বা স্টাম্প

ডাকটিকিট বা  স্টাম্প                                                        পৃথিবীতে প্রথম কি ভাবে প্রচলন হলো আর কেমন ছিলো  *********...