ডাকটিকিট বা স্টাম্প

ডাকটিকিট বা  স্টাম্প

                                                       পৃথিবীতে প্রথম কি ভাবে প্রচলন হলো আর কেমন ছিলো  ***********************************************
ডাক ব্যবস্থার প্রচলন বহু আগেই ॥  বলা যায় অতি প্রাচীন কালে। বহুকাল আগেই মানুষ চিঠি আদান প্রদানের জন্য ডাক প্রচলন করেছিলো । ইতিহাস বলছে 230  খ্রিষ্টপূর্বে ও ডাকের ব্যবহার ছিল। ভারতবর্ষে উচ্চ মানের ঘোড়ার ডাকের প্রচলন করেন শেরশাহ॥  অতি পুরোনো কালেও - ডাকের উল্লেখ পাওয়া যায় এবং সেখানে লেখাথাকতো-  দূতের নাম, প্রাপকের নাম, ডাক চলাচলের পথের নকশা ইত্যাদি। পরবর্তীতে ডাক ব্যবস্থার নানা পদ্ধতি চালু হয়। কিন্তু এইসব পদ্ধতি ছিল সনাতন। পূর্বের পদ্ধতি গুলোতে নানা ধরণের সমস্যা দেখা দিত। পরবর্তীতে ডাক ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য বহু দেশে বহু মানুষ কাজ করেছেন। কিন্তু তখনকার চিঠিতে কোন ডাকটিকিট ব্যবহার করা হত না। চিঠিতে ডাকটিকিটের ব্যবহার শুরু হয় 1 মে 1840 সালে। এর আগে ডাক মাশুল আদায় করা হত চিঠির পাতার সংখ্যার উপর এবং কত দূরে চিঠি প্রেরণ করা হচ্ছে সেই দূরত্বের উপর ভিত্তি কড়ে । ডাক মাশুল দিতে হত চিঠির প্রাপক কে। কোন কারণে প্রাপক সেই চিঠি গ্রহণ না করলে বা ঠিকানা ভুল হলে -  সেই চিঠি প্রাপকের কাছে না পৌঁছালে চিঠি প্রেরকের কাছে ফিরে আসতো। প্রেরককে তখন জরিমানা সহ ডাক মাশুল দিয়ে সে চিঠি ছাড়িয়ে নিত। অনেকেই এই প্রকার ফেরত আসা চিঠি গ্রহণ করতে চাইতেন না। এক সময় দেখা গেল ব্রিটিশ ডাক বিভাগের দপ্তরে ফেরত আসা চিঠি জমা হতে হতে স্তূপাকার ধারণ করে। এদিকে ডাক মাশুলের টাকা আদায় করতে না পেরে ব্রিটিশ ডাক প্রশাসন প্রচুর লোকসান হতে থাকে। দিন দিন বাড়ছিল চিঠি ফেরতের পরিমাণ। এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন ছিল ডাক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। আর এই পরিবর্তন হয় স্যার রোল্যান্ড হিলের হাত ধরে। তিনি সর্ব প্রথম ডাকটিকিট আবিষ্কার করেন।

বেশ কয়েকটি মজার ঘটনা থেকে তিনি ডাকটিকিটের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তিনি তাঁর প্রেমিকাকে নিয়মিত চিঠি লিখতেন। এক দিন হলো কি ! ! - তিনি তাঁর প্রেমিকার চিঠির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কারন ঐ দিন তাঁর প্রেমিকার কাছ থেকে চিঠি আসার কথা ছিল। পিয়ন তাকে চিঠি দিয়ে ডাক মাশুলের জন্য এক শিলিং দিতে বললেন। তখনকার নিয়ম ছিল প্রাপক ডাক মাশুল পরিশোধ করবেন। তিনি ডাক মাশুল বাবদ এক শিলিং পরিশোধ করলেন। তখনকার দিনে এক শিলিং ডাক মাশুল হিসেবে অনেক টাকা। তিনি ভাবতে লাগলেন গতমাসে তিনি তাঁর প্রেমিকাকে 6 টি চিঠি লিখেছিলেন। তাই তাঁর প্রেমিকাকে ছয় শিলিং ডাক মাশুল পরিশোধ করতে হয়েছে। তিনি ব্যাপারটি চিন্তা করে মনে মনে অনুশোচনা করলেন। এর পরের মাস থেকে তিনি চিঠি লেখার পরিমাণ কমিয়ে দিলেন এবং কারণটা তিনি চিঠির মাধ্যমে তার প্রেমিকা কেও জানালেন। তিনি ভাবতে লাগলেন যিনি চিঠি লিখবেন ডাক মাশুল তাকেই পরিশোধ করা উচিত। আরেক টি ঘটনা। রোল্যান্ড হিল ছিলেন স্কুলের শিক্ষক। প্রতিদিন সকালেই তাকে স্কুলে যেতে হয়। নির্দিষ্ট সময়ে তিনি স্কুলের উদ্দেশ্যে বের হন। প্রতিদিনের মত সেদিন ও তিনি সকালবেলা বাড়ি থেকে বের হয়েছেন -  দেখলেন কি এক বৃদ্ধা মহিলার সাথে পিয়নের ঝগড়া লেগেছে। তিনি এগিয়ে গিয়ে জানতে চাইলেন কি ব্যাপার ? - পিয়ন জানালেন বৃদ্ধার ছেলে বৃদ্ধাকে চিঠি লিখেছে এবং বৃদ্ধা সেটা ছাড়িয়ে নিতে নারাজ। কারণ চিঠি ছাড়াতে হলে বৃদ্ধাকে তিন শিলিং খরচ করতে হবে। এবং বৃদ্ধা তা দেবেন না । তিনি বৃদ্ধার হয়ে তিন শিলিং দিয়ে চিঠি ছাড়িয়ে দিলেন। বৃদ্ধা বললেন তুমি বৃথাই তোমার তিন শিলিং নষ্ট করলে। চিঠির উপরে কিছু সাংকেতিক চিহ্ন রয়েছে যেগুলো দেখে আমি বুঝেছি চিঠিতে কি লেখা রয়েছে। এই ঘটনাটাও রোল্যান্ড হিল কে গভীর ভাবে নাড়া দেয়। কারণ এইভাবে জনগণ ডাক মাশুল ফাঁকি দিত। তিনি এই সমস্যার সমাধানের কথা ভাবতে লাগলেন। তিনি চাইছিলেন দীর্ঘদিনের পুরনো ডাক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসুক। তিনি প্রস্তাব রাখেন যে যিনি চিঠি লিখবেন তিনি ডাক মাশুল পরিশোধ করবেন। এই সকল বিষয় তিনি পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করেন। 1837 সালে তাঁর সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে POST OFFICE REFORM; ITS IMPORTANCE AND PRACTICABILITY নামক পুস্তক প্রকাশ পায়। এই বই প্রকাশের পর ব্যাপক সাড়া পড়ে। জনগণ চাইছিলেন যেন এই পদ্ধতি ডাক বিভাগ চালু হোক । বৃটিশ জনগণ আবেদন পত্র  ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রেরণ করেতে শুরু করে। এই চাহিদার প্রেক্ষিতে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ডাকটিকিট প্রকাশের জন্য অনুমোদন দান করেন। ডাকটিকিটের জন্য নকশা আহবান করা হয়। প্রচুর মানুষ সেই আহবানে সাড়া দিয়ে নকশা জমা দিতে থাকে। দেখতে দেখতে 2500 টি নকশা ডাক বিভাগে জমা পড়ে। এত বিপুল সংখ্যক নকশার মধ্যে থেকে একটিও ডাক বিভাগের পছন্দ হয়নি। অবশেষে রোল্যান্ড হিলকেই নকশার জন্য বলা হয়। রোল্যান্ড হিল ভাবছিলেন কিভাবে ডাকটিকিটের নকশা করবেন। একটি মেডেল দেখে ডাকটিকিট তৈরির ধারণা পেয়ে যান। মেডেলে ছিল রাণী ভিক্টোরিয়ার ছবি খোদাই করা। তিনি ডাকটিকিটে রানি ভিক্টোরিয়ার প্রতিকৃতি ব্যবহার করতে চাইলেন। এই ডাকটিকিটের মাঝখানে ছিল রাণী ভিক্টোরিয়ার মুখমন্ডল ছবি। ডাকটিকিটের উপরে বড় করে লেখা ছিল POSTAGE এবং নিচের দিকে লেখা ছিল ONE PENNY. এছাড়া ডাকটিকিটের উপরে দুই কোনায় দুটি স্টার চিহ্ন এবং নিচে দুই কোনায় প্লেটের নম্বর অনুযায়ী বিভিন্ন অক্ষর ছিল। এই ডাকটিকিটে কোন দেশের নাম উল্লেখ ছিল না। কারণ তখন আর কোন দেশেই ডাকটিকিট ব্যবহার করা হত না। তাই দেশের নাম উল্লেখ করার প্রয়োজন পড়তো না। এই ঘটনাকে সম্মান দেখিয়ে এখনো পর্যন্ত ব্রিটিশ ডাক বিভাগ থেকে প্রকাশিত ডাকটিকিটে দেশের নাম লেখা থাকে না। এই ডাকটিকিট ছাপানোর দায়িত্ব পায় তখনকার বিখ্যাত প্রেস মেসার্স পারকিন্স বেকন এন্ড কোম্পানি। তারা এক পেনি ও দুই পেনি মূল্যমানের ডাকটিকিট ছাপাতেন। 11  এপ্রিল 1840 সালে তারা ডাকটিকিট ছাপানোর দায়িত্ব পায় এবং 1 মে 1840 সালে ডাকটিকিট চালু হয় ।  এক পেনির ডাকটিকেট কে ডাকা হত পেনি ব্লাক বলে কারণ এক পেনির ডাকটিকিট ছিল কালো রঙয়ের। আর দুই পেনি মূল্যের  ডাকটিকিটকে ডাকা হত পেনি ব্লু নামে। কারণ এর রং ছিল নীল রঙয়ের। তখন ডাকটিকিট ক্যানসেল করা হত লাল কালি দিয়ে। এই লাল কালি পেনি ব্লাকের উপর বেশি স্থায়ী হত না। ফলে অনেকে লাল কালি ঘষে তুলে ফেলে তা আবার ব্যবহার করে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য পেনি ব্লাক পরিবর্তন করে ছাপানোর হয় লাল কালিতে। ফলে পেনি ব্লাক ডাক টিকিট এর নাম হয় -  পেনি রেড।
এই ভাবেই এক মানুষ রোল্যণ্ড লি - তাঁকে বলা হয় - The Father of Postage stamps ,  সভ্যতার বুকে এক মহান নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন তিনি। সেই সুফল আজ আমরা ভোগ করছি । ডাকটিকিট মানব সভ্যতার এক্ বিশাল দান তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না ।  ************************************************* নীচে - প্রথম ডাকটিকিট এর ছবি । facebook থেকে

শাড়ীর _উৎপত্তি_ ও _আদি _কথা॥

শাড়ীর _উৎপত্তি_ ও _আদি _কথা॥  ***************************************


<> আর্যরা ভারতবর্ষে আসার আগেই  ‘শাটী’ শব্দটির অস্তিত্ব ছিল। সেই হিসেবে বলা যেতেই পারে, শাড়ির ইতিহাস বোধ হয় সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার বছর কিংবা তারও বেশি পুরানো। শাটি শব্দের অপভ্রংশ রূপ - শাড়ি ।  মধ্যভারতীয়- আর্যরা  ‘শাড়ি’কে আরও বিভিন্ন শব্দে আখ্যায়িত করত - যেমন-‘সাটক’, ‘সাটিকা’। আবার ‘মহাভারত’এ  উল্লিখিত দ্রৌপদীর ‘বস্ত্রহরণ’ করা হয়েছিল, সেটাও অনুমিত হয়, শাড়িই ছিল। গুপ্ত যুগের (আনুমানিক 300 থেকে 500 সাল পর্যন্ত) বিখ্যাত কবি কালীদাসের ‘কুমারসম্ভব’য়ে শাড়ির কথা উল্লেখ আছে। এছাড়া  ইলোরা অজন্তা গুহার বহু প্রাচীন চিত্রাবলি বলে দেয়, খ্রিস্টাব্দ শুরুর সময়ে শাড়ির অস্তিত্ব ছিল। ইলোরা অজন্তার মতো পাহাড়পুর-ময়নামতির পোড়ামাটির ফলক থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়, হাজার বছর আগে এই বঙ্গে শাড়ির প্রাধ্যন্য ছিল। ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, আদিমকালে পূর্ব-দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে সেলাই করা কাপড় পরার প্রচলন ছিল না। এই অখণ্ড বস্ত্রটি পুরুষের পরিধানে থাকলে হত ‘ধূতি’, আর মেয়েদের পরিধানে থাকলে ‘শাড়ি’। এছাড়া মধ্যযুগের কবিদের কাছ থেকে শুধু শাড়ির কথাই জানা যায় না, শাড়ির রংয়ের কথাও জানা যায়। চৌদ্দ শতকের কবি চণ্ডীদাস লিখেছেন— ‘নীল শাড়ি মোহনকারী/উছলিতে দেখি পাশ।’ ফ্যানি পার্কস 1851 সালে তাঁর বইয়ে লিখেছেন— ‘ধনী মহিলারাও শাড়ি পরত। আর শীতের সময় ঠাণ্ডার হাত থেকে বাঁচার জন্য বাড়তি হিসেবে ব্যবহার করত চাদর।’তবে তখনও পেটিকোট বা সায়ার প্রচলন হয়নি ॥ ভারতবর্ষের নারী তথা বাংলার নারীরা যুগ যুগ ধরে শাড়িকে তার প্রধান পরিধেয় বস্ত্র হিসেবে আঁকড়ে রেখেছে। ভারতীয় উপমহাদেশের নারীর পরিধেয় বস্ত্র। শাড়ি আবহমান ধরে বাংলার ইতিহাসে শাড়ির স্থান অত্যন্ত যে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো তা বোঝা যায় ।  যুগে যুগে শাড়ির পাড়-আঁচল, পরার ধরন আর বুনন কৌশল - পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু তার মহিমা হ্রাস পায়নি ।  ‘শাড়ি’ শব্দের উৎস সংস্কৃত ‘শাটী’ শব্দ থেকে এসেছে বলে মনে হয়। ‘শাটী’ শব্দের অর্থ পরিধেয় বস্ত্র। ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার প্রাচীন ভারতের পোশাক নিয়ে বলেছেন যে তখন মেয়েরা আংটি, দুল, হার এসবের সঙ্গে পায়ের গোছা পর্যন্ত শাড়ি পরিধান করত, উপরে জড়ানো থাকত আধনা (আধখানা)। পাহাড়পুরে পাল আমলের (750 খ্রীঃ ) কিছু ভাস্কর্য দেখেই তিনি তা অনুমান করেন। এই তথ্য অনুযায়ী বলা যায় যে, অষ্টম শতাব্দীতে শাড়ি ছিল প্রচলিত পোশাক। ভারতের গোটা উপমহাদেশে " সেলাই করা কাপড়" - পরার রেওয়াজ আদিম কালে ছিল না। বয়ন শিল্পের উৎপত্তির সঙ্গে শাড়ির অনুসঙ্গ বদল হয়েছে তখন যেহেতু সেলাই করার কৌশল জানা ছিল না তাই সেলাই ছাড়া টুকরা কাপড় পরাই ছিল শাস্ত্রীয় বিধান। এ সময়ে সেলাই ছাড়া কাপড় পরার রেওয়াজ উপমহাদেশের বাইরেও প্রচলিত ছিল। পৃথিবীর অন্যান্য সভ্যতায়, যেমন মিশর, রোম, গ্রিস-এ সেলাই ছাড়া বস্ত্র ঐতিহ্য হিসেবেই চালু ছিল। সেলাই করার জ্ঞান লাভ হওয়ার পর এই অখন্ড বস্ত্রই নানা এলাকায় বিচিত্ররূপে ও বিভিন্ন নামে রূপান্তরিত ও আদৃত হয়, যেমন ঘাগরা, সালোয়ার, কুর্তা, কামিজ প্রভৃতি। কিন্তু কয়েকটি এলাকায় ওই বসনখন্ড সেলাই ছাড়াই টিকে থাকে। এসব এলাকা হচ্ছে আজকের বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, আসাম, কেরালা, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্র প্রদেশ, গুজরাট, উত্তর প্রদেশ, হিমাচল প্রদেশ, বিহার, পাঞ্জাব এবং পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশ ও পাঞ্জাব। তাই বলা যায়, শাড়ি আর একমাত্র বাঙালি নারীর পরিধেয় বস্তু নয়, বর্তমান যুগে বাঙালি রমণীর পোশাক হিসেবেই শাড়ির অধিক পরিচিতি। . আজকের শাড়ি অখন্ড হলেও তার সঙ্গে যোগ হয়েছে আরও বস্ত্র যা সেলাই করা অর্থাৎ অখন্ড শাড়ি নয়। শুধু শাড়ি পরার প্রথা আজ আর নেই,- শাড়ি” বাঙালির পরিচয়ের সাথে মিশে আছে বাংলার অহংকার হয়ে। সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীনতম পরিধেয় বস্ত্র এই শাড়ি॥

দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতের নারীরা শাড়িকেই নিজেদের পরিধানের প্রধান বস্ত্র হিসেবে আঁকড়ে ধরেছে। মোগলদের মধ্যে সম্রাট আকবরই ভারতবর্ষের সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা শুরু করেন। সেই ধারাবাহিকতায় শাড়িতেও মোগলাই আভিজাত্যের সংযোজন। মোগলদের আগ্রহের জন্য মসলিনের শাড়ির উপস্থিতিও থাকত জেনানা মহলে। মোগলদের জন্য মসলিন কাপড় সংগ্রহের জন্য সরকারি লোক নিয়োগ দেওয়া হত। আর সম্ভবত মোগল আমলে শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজ পরিধানের রীতি চালু হয়। তবে সেসময় শাড়ি পড়া হত এক প্যাঁচে।

উনিশ শতকের চল্লিশ দশক থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়কে বলা হয়ে থাকে ‘ভিক্টোরিয়ান যুগ’। এ যুগে ফ্যাশনের মূল কথাই ছিল কাপড়ে সারা শরীর ঢাকা থাকতে হবে। ব্রিটিশদের সংস্পর্শে থাকা জমিদার ও স্থানীয় ধনীদের পোশাক-পরিচ্ছেদেও ভিক্টোরিয়ান ফ্যাশনের স্টাইল যোগ হয়। এ সময়ে শাড়ির সঙ্গে ফুলহাতা ব্লাউজ এবং পেটিকোট পরার চল শুরু হয়। এই রীতিতে শাড়ি পরাটা বাঙালি নারীর চিরায়ত এক প্যাঁচে শাড়ি পরার ধারণাকে সম্পূর্ণ পালটে দেয়।

ভারত বিভাগের পূর্বে এদেশে নারীরা আধুনিক শাড়ি পরার চলন-বলন শিখেছেন মূলত ঠাকুর বাড়ির কল্যাণে৷ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাই সত্যেন্দ্রনাথের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনীর অবদানের কথা এ ক্ষেত্রে স্মরণ করতে হয়৷ শাড়ির স্টাইলিশ রূপটি আমরা দেখতে পাই 60 ’এর দশকে৷ কারণ ফ্যাশন বা লুক যাই হোক না কেন - সাজ-পোশাক নিয়ে বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্ট এ দশকেই দেখা যায়৷

সুতির পাশাপাশি সিল্কের শাড়িও জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে ॥ সত্তর দশকে বিপুল পরিবর্তন হয় -  শাড়ির সাথে কনট্রাস্ট এবং গোল গলা আর লম্বা হাতের ব্লাউজ ফ্যাশনটিও চালু হয় এ সময়৷ তবে প্রাক আশির দশক থেকে শাড়ির ফেব্রিক্স ও বুননে ভিন্নতার ছোঁয়া পরিলক্ষিত হয়৷ মসলিন, জামদানী, জর্জেট, কাতানের পাশাপাশি সুতির উপর এক্সপেরিমেন্টাল কাজের ট্রেন্ডও চালু হয়৷ নব্বই দশক থেকে পরবর্তী দেড় দশকের শাড়ির ডিজাইনে  হ্যান্ডপেইন্ট, স্প্রে, বাটিক, সিকোয়েন্স, ডলারব্যবহৃত হতে থাকে৷ পরবর্তীতে এ ডিজাইনগুলোর সঙ্গে আরো যুক্ত হয় অপ্রেলিক্স   করচুপি, ফ্লোরাল মোটিভ ইত্যাদি ॥                      আজ থেকে 100 বছর আগে শাড়ির সঙ্গে অনিবার্য হিসেবে সব শ্রেনীর জন্য এসেছে ব্লাউজ ও পেটিকোট বা সায়া নামের অন্তর্বাস- পরিধান॥ যা শুরু হয়েছিলো সম্ভবত আকবরের সময়ে - যা আমি আগেই জানিয়েছি ॥  তবে এই দশক থেকে শাড়ি কে ভারত বাসী মহিলা রা ধীরে ধীরে বিদায় জানাচ্ছে । সুবিধা ও স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য বিদেশী পোশাক বাঙ্গালী তথা ভারত বাসীর মহিলা দের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠ্চ্ছে ॥-  একদিন হয়তো ধুতি ও শাড়ি মিউজিয়াম এ রাখা থাকবে - যে বঙ্গের পুরুষরা ধুতি পরতেন আর  ভারতীয় ও বঙ্গের নারীরা শাড়ি  পরতেন । @ বাকি মত পাঠক পাঠিকা দেবেন । আজ এখানেই শেষ করি ॥ ......নমস্কার । ভবেশ রুদ্র ।

অতীত-বর্তমানের পতিতা ও পতিতাবৃত্তির ইতিহাস

■  অতীত-বর্তমানের পতিতা ও পতিতাবৃত্তির ইতিহাস


____________________________________________

[  রাজা রামমোহন রায় , কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিয়মিত পতিতালয়ে যেতেন  ]

হাজার বছরের এক পুরাতন ব্যবসার নাম পতিতাবৃত্তি । বিচিত্র এই দোকানীরাই আমাদের সমাজে পতিতা, গণিকা, বেশ্যা, রক্ষিতা নানাভাবে পরিগণিত হয় । তবে সভ্যতার বিবেচনায় একে অন্ধকার গলি বলা হয়ে থাকে। হয়তো অন্ধকার গলি বলেই আলোর মানুষেরা চেনে না এ গলি, জানে না এ জগৎ । কিন্তু তারপরও সত্য, কৃষ্ণ গহ্বরের মত অস্তিত্বমান এই অন্ধকার গলি । খুব সুনির্দিষ্ট করে হয়তো বা বলা মুশকিল পৃথিবীর ইতিহাসে কবে কখন কিভাবে উৎপত্তি ঘটেছে বিচিত্র এ ব্যবসার। তবে যতদুর জানা যায় মধ্যযুগীয় বর্বরতার গর্ভে অর্থাৎ সামন্তীয় সমাজের পাপের ফসল এই পতিতাবৃত্তি ।
পতিতা অর্থাৎ বেশ্যারা হলো সেই সকল নারী যারা পুরুষকে যৌন সুখ ভোগ করতে নিজেদের দেহ দিয়ে আপন জীবিকা উপার্জন করে। পতিতা প্রয়োজনমত নিজেকে সর্বদা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও অলঙ্কারে ভূষিতা রাখে । যেন এক প্রকার পণ্য দ্রব্য । তারা সব সময় মনে করে সৌন্দর্য্য দিয়ে পুরুষকে জয় করতে পারলেই মিলবে তার যাচিত অর্থ । বেশ্যাদেরও ঘটক বা দূত থাকে । তারা অন্য লোককে তার গুণ পণ্য বলে তাকে আকর্ষন করে নিয়ে আসে । পতিতাদের অসংখ্য নামে ডাকা হতো ইতিহাসের আদিকাল থেকেই ॥ যেমন – দেহপসারিণী, বেশ্যা, রক্ষিতা, খানকি, উপপত্নী, জারিণী, পুংশ্চলী,অতীত্বরী, বিজর্জরা, অসোগু,গণিকা ইত্যাদি । তবে কামসুত্র গ্রন্থের লেখক ‘বাৎস্যায়ন’ পতিতাদের ৯ টি ভাগে ভাগ করেছেন, তা হলো – “বেশ্যা বিশেষ প্রকরণ – ‘কুম্ভদাসী, পরিচারিকা, কুলটা, স্বৈরিণী, নটি, শিল্পকারিকা, প্রকাশ বিনষ্টা, রূপজীবা এবং গনিকা। ঋগবেদের প্রথম মণ্ডলের ১২৬ তম সূক্তের পঞ্চম ঋকে আছে – “সুবন্ধবো যে বিশ্যা ইব ব্রা অনস্বন্তঃ শ্রব ঐযন্ত পূজা” । ‘পতিতা বৃত্তির ইতিহাস’ নামক বইয়ে পতিতাবৃত্তির সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে – “পতিতা অর্থাৎ বেশ্যারা হলো সেই সমপ্রদায় ভুক্ত নারী যারা পুরুষকে যৌন সুখ ভোগ করাতে নিজেদের দেহ দিয়ে – জীবিকা অর্জন করে ।” তবে জর্জ রালি স্কট তার বইতে, আরো এক শ্রেনির পতিতার কথা বলেছেন, যারা অর্থ ছাড়াই পুরুষদের সাথে যৌন সম্পর্ক করে তাদেরকে তিনি ‘পেশাহীন পতিতা’ বলে অভিহিত করেছেন । মানব জন্মের শুরু থেকেই মানুষকে বাঁচার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে । কিন্তু সমাজ বিবর্তনের একটি পর্যায়ে এসে নির্দিষ্টভাবে নারী দেহ বিক্রির মাধ্যমে আয়ের একটি ব্যবস্থা চালু হয়ে গেল। এর নাম পতিতাবৃত্তি যা ঘৃণিত। অথচ স্বীকৃত পেশা হিশেবে আজ বিশ্বব্যাপী প্রচলিত । অপরদিকে প্রকৃতি মানুষকে যে কয়েকটি সাধারণ জিনিস দিয়েছে যেমন ক্ষুধা, ঘুম, লোভ, দয়া, জৈবিক তাড়না ইত্যাদি । তারমধ্যে সবচেয়ে জোরাল জিনিস হচ্ছে ক্ষুধা ও জৈবিক তাড়না । পুরুষ যখন যৌনক্ষুধা মেটাবার জন্য স্ত্রী ব্যতিরেকে যখন অবৈধভাবে অন্য নারীর সঙ্গে কামনা করে, অন্যদিকে নারী তার অন্ন-বস্ত্রের সংগ্রহের প্রয়োজনে তার দেহদান করতে প্রস্তুত হয় । তখনই একটা আর্থিক বিনিময়ের মাধ্যমে পারস্পরিক একটা অবৈধ যৌনসম্পর্ক স্থাপিত হয় । এটা হল পতিতাবৃত্তির পেশাগত রূপ, তা সামাজিকভাবে ও নৈতিকতার দৃষ্টিতে দোষণীয় হোক আর না হোক- এই পদ্ধতি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত । কিন্তু এর বাইরেও অবৈধ যৌনসম্পর্ক স্থাপিত হয়। তবে পতিতাবৃত্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল পুরুষ আর্থিক মূল্যের বিনিময়ে নারীদেহ ভোগ করবে যেখানে নারীর যৌন চাহিদার প্রশ্ন অবান্তর । পতিতাবৃত্তির উৎপত্তি সৃষ্টির আদিকাল থেকেই। বিশেষত অর্থের বিনিময়ে যৌনতা বিক্রির ইতিহাস সুপ্রাচীন । ওয়েবস্টার অভিধান মতে, সুমেরিয়ানদের মধ্যেই প্রথম পতিতার দেখা মেলে। প্রাচীন গ্রন্থাদিসূত্রে, যেমন ইতিহাসের জনক হিসেবে খ্যাত হিরোডেটাস ( খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮৪-খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩০/২০)-এর লেখায় এই পতিতাবৃত্তির বহু নমুনা পাওয়া যায়, যেটি প্রথম শুরু হয়েছিল ব্যাবিলনে । সেখানে প্রত্যেক নারীকে বছরে অন্তত একবার করে যৌনতা, উর্বরতা ও সৌন্দর্যের দেবী আফ্রোদিতির মন্দিরে যেতে হতো এবং সেবাশুশ্রূষার নমুনা হিসেবে একজন বিদেশীর সাথে নামমাত্র মূল্যে যৌনসঙ্গম করতে হতো। একই ধরনের পতিতাবৃত্তির চর্চা হতো সাইপ্রাস এবং করিন্থেও। এটি বিস্তৃত হয়েছিল সার্দিনিয়া এবং কিছু ফিনিশীয় সংস্কৃতিতে, বিশেষ করে ইস্টার দেবতার সম্মানে। ফিনিশীয়দের মাধ্যমে ক্রমশ এটি ভূমধ্যসাগরের অন্যান্য বন্দর শহরগুলোতেও সংক্রমিত হয়, যেমন সিসিলি, ক্রটন, রোসানো ভাগলিও, সিক্কা ভেনেরিয়া এবং অন্যান্য শহরে। এক্ষেত্রে অনুমান করা হয় এশিয়া মাইনর, লাইদিয়া, সিরিয়া ও এট্রাকসনের নাম। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সমাজে পতিতারা ছিল স্বাধীন এবং তারা বিশেষ ধরনের পোশাক পরিধান করা ও কর দেওয়ার ব্যাপারে আদিষ্ট ছিল। গ্রিক হেটায়েরার মতো জাপানেও এই প্রথার চল ছিল ।
‘আইয়্যামে জাহেলিয়া’ যুগে আরবে পতিতাবৃত্তি সহ আরো অনেক খারাপ কাজ চালু ছিল॥ ইতিহাসবিদ পি.কে হিট্টি বলেন,’মহানবী (সাঃ) এর আবির্ভাবের একশ বছর আগে আইয়্যামে জাহিলিয়া শুরু হয়।’ ঐ যুগে ইমরুল কায়স,তারাকা আমর,লাবীদ, যুহায়ের নামক কবি অশ্লীল কবিতা রচনা করতো । এ ব্যাপারে মাওলানা আকরাম খাঁ তার বইয়ে লিখেছেন,’পুংমৈথুন, স্ত্রীমৈথুন এবং পশু মৈথুন তাদের ভিতর প্রচলিত ছিল এবং তা তারা স্বাভাবিক হিসেবে বিবেচনা করতো।’ ” প্রাচীন গ্রিস , এথেন্স ও রোমে বহু বছর আগেই পতিতা বৃত্তি চালু হয়েছিল । এমনকি সেসময় অনেককে বাধ্য করা হতো পতিতাবৃত্তি করতে । ইউস্তিয়ানের স্ত্রী রোমক সম্রাজ্ঞী থেওডেরো প্রথম জীবনে বেশ্যা ছিলেন । পৃথিবীতে প্রথম বেশ্যাবৃত্তি পেশার মতো লাইসেন্স বা নিবন্ধন দেওয়া ও কর ধার্য করা হয় রোমান আমলেই। অ্যাথেন্সের আইন প্রণেতা ও কবি সোলোন (খ্রি.পূ. ৬৩৮-খ্রি.পূ. ৫৫৮) যিনি প্রাচীন গ্রিকের তৎকালীন সাতজন জ্ঞানী লোকের একজন হিসাবে গণ্য হতেন, তিনি খ্রিস্টপূর্ব ছয় শতকে এথেন্সে প্রথম বেশ্যালয় স্থাপন করেন । “মহাভারতে উল্লেখ আছে যে,একজন বেশ্যা ভাল প্রকৃতির হলে উচ্চতর জীবনে পুনর্জন্ম লাভ করতে পারে । এই জীবিকা সম্বন্ধে বৌদ্ধ ধর্মেরও একই মত। মহাভারতের যুগে এমন জনা পাঁচেক বিখ্যাত মুনি ঋষির নাম উল্লেখ করা যায়, যাঁরা ‘স্বর্গবেশ্যা’ দেখে কামার্ত হয়ে তাঁদের সঙ্গে যৌন মিলন করেছিলেন। বিশ্বামিত্র, শরদ্বান, ভরদ্বাজ, ব্যাস, বশিষ্ঠ, পরাশর, দীর্ঘতমা – এরাই হলো সেইসব মুনি ! মহাভারতের যুগে অপরাপর সম্মান জনক বৃত্তি গুলির মধ্যে পতিতা বৃত্তিই ছিল অন্যতম। রাজদরবারে ও বিবিধ রাজকীয় অনুষ্ঠানে পতিতাদের উপস্থিতি ছিল অপরিহার্য। ঐ কারণেই বিশিষ্ট প্রত্নতত্ত্ববিদ ও নৃতত্ত্ববিদ ডঃ অতুল সুর লিখেছেন – ‘মৈথুন ধর্মটাই সেকালের সনাতন ধর্ম ছিল’। এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা অনুযায়ী, কৌটিল্যর আরেক নাম ছিল চাণক্য । তিনি প্রাচীন ভারতের রাষ্ট্রবিজ্ঞান গ্রন্থ ‘অর্থশাস্ত্রের’ রচয়িতা । তিনি প্রথম মৌর্যসম্রাট চন্দ্রগুপ্তের (খ্রিষ্টপূর্ব ৩২১ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ২৯৭) কাউন্সেলর ও উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁর রচিত বিখ্যাত অর্থশাস্ত্রের মতে, দেহব্যবসা একটি প্রতিষ্ঠিত প্রথা । পুরোপুরি ঘৃণিত বা গোপন নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্র এর অনুমোদন করে এবং সংগঠকের ভূমিকা নেয় । ঋগ্বেদ এবং জাতকেও এর অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন পণ্ডিতরা । কৌটিল্য জানান যে, তখন দেহব্যবসা ছিল মূলত শহরকেন্দ্রীক। নগরজীবনের অবশ্যঅঙ্গ ছিল এটি। রাজকোষের আয়ের যে বিভিন্ন উৎস ছিল তার মধ্যে ‘দুর্গ’ নামক বিভাগটিতে বেশ্যা, জুয়াখেলা ও আবগারী বিভাগের পরিদর্শকের কথা বলেছেন কৌটিল্য। অর্থশাস্ত্রে এমনকি গণিকাধ্যক্ষেরও উল্লেখ আছে। তাঁর কাজ ছিল রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে গণিকাদের সংগঠিত ও দেখাশোনা করা । কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র থেকে পতিতা ও পতিতাবৃত্তি সংক্রান্ত ভারতবর্ষের যে চিত্র পাওয়া যায় টা নিয়ে পণ্ডিতে-পণ্ডিতে মতদ্বৈধতা আছে । প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ ও কূটনীতিক মেগান্থিনিস প্রথম মৌর্যশাসক চন্দ্রগুপ্তের সময়ে ভারতে এসেছিলেন। অর্থশাস্ত্রে গণিকারা সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যারা দেহব্যবসা করতেন তাদের একটি তালিকা দেওয়া আছে– যথা পুংশালী অর্থাৎ সাধারণ দেহব্যবসায়ী, সুরাসুন্দরী অর্থাৎ পানশালার ওয়েটার, বন্ধকী অর্থাৎ ঘটনাচক্রে দেহব্যবসায় জড়িয়ে পড়া গৃহবধূ, বেশ্যা অর্থাৎ কারুকুশীলব বা গুপ্তচর, সাধ্বি-ব্যঞ্জনা অর্থাৎ সতীত্বের ভান করে থাকা পুলিশের গুপ্তচর, দেবদাসী অর্থাৎ মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত পবিত্র বারাঙ্গনা, পরিব্রাজিকা অর্থাৎ আড়কাঠি বা দালাল । এঁদের সামাজিক মর্যাদা ছিল রাজঅনুগ্রহপুষ্ট গণিকাদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম । যুদ্ধক্ষেত্রে, শিকারে এবং আরো অনেক সময় রাজার সঙ্গে গণিকাদের থাকবার কথা লিখেছেন গ্রিক লেখকরা । বৌদ্ধ গ্রন্থগুলোতে বিখ্যাত গণিকা অম্বাপালী, সালাবতী, সামা, সুলমা ছাড়াও এমন অনেকের কথা বলা আছে, যারা বুদ্ধি ও শিল্পীত দক্ষতার গুণে সমাজে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। অর্থাৎ তৎকালীন গণিকা নারীরা সমাজে-রাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হিসেবে সম্মান পেতেন এবং সাধারণ সভ্যসমাজের প্রতিনিধিরা ছাড়া রাজরাজড়ারাও তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন। তাদেরকে যখন তখন যে কেউ ভোগার্থে ব্যবহার করতে পারত না কিংবা মন্দ কথা বলতে পারত না। এমনকি গণিকাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিরও অধিকার ছিল। রাজকোষ থেকে বেতন ছাড়াও তাঁরা অলংকার, পোশাক-আশাক, অন্যান্য উপঢৌকন, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি লাভ করতেন। কোনো গণিকার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁর সঙ্গে বা তাঁর অবিবাহিতা মেয়ের সঙ্গে বলপূর্বক দেহমিলনের চেষ্টা করলে সর্বোচ্চ আর্থিক সাজা হতো। সে সময় আরো এক ধরনের পতিতাবৃত্তি চালু ছিল ভারতে – ক্তিমূলক পতিতাবৃত্তি। অর্থাৎ পতি বা পত্নী ব্যতীত অন্য কারও সাথে পবিত্র বা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে যৌন মিলন। এ ধরনের কাজে যে ব্যাক্তি জড়িত থাকেন তাকে বলে দেবদাসী। দেবদাসী মন্দির সেবিকা। বর্ধিত অর্থে মন্দিরের বারাঙ্গনা, দেহোপজীবিনী বা গণিকা। এখনো গোপনে ভারতের অনেক মন্দিরে দেবদাসী প্রথা চালু আছে । এছাড়া “উত্তর ভারতে জিপসি সম্প্রদায়ের মধ্যে মেয়ে শিশুকে পতিতা বানানোর এক ধরনের প্রথা ছিল। বিহার ও উত্তর প্রদেশে ছিল নায়েক,পশ্চিম ভারতের গুজরাটে দেহে ও বর্ণের পতিতা এবং দাক্ষিণাত্যে ছিল মোহর নামক উপজাতীয় পতিতা। ” সপ্তম শতকের রাজা হর্ষবর্ধনের সভাকবি ছিলেন বানভট্ট। বানভট্ট তাঁর “কাদম্বরী” গ্রন্থে লিখেছেন,সেকালে বেশ্যারাই দেশের রাজাকে স্নান করাতো। এমনকি রাজার পরনের সব পোশাক বেশ্যারাই পরিয়ে দিতো। “নবম শতকে ‘কুট্টনীমত’ গ্রন্থ লিখেছিলেন কাশ্মীরের মন্ত্রী ও কবি ‘দামোদর গুপ্ত’। ‘বিকরবালা’ নামের এক বৃদ্ধা বেশ্যার উপদেশ নামা নিয়েই মুলতো ‘কুট্টনীমত’ গ্রন্থ লেখা। বাৎসায়নের কামসূত্রের মতোর ‘কুট্টনীমত’ একটা কামশাস্ত্র গ্রন্থ॥” এছাড়া মহাকবি কালিদাসের মহাকাব্য গুলিতেও বেশ্যা নারীর উল্লেখ আছে। দোনা গাজির- সয়ফুল মুলক বদিউজ্জামাল, আবদুল হাকিমের- লালমতি সয়ফুল মুল্লুক, শুকুর মাহমুদের- গুপীচন্দ্রের সন্ন্যাস — এইসব কাব্য পুথিতে বেশ্যা- সংস্কৃতির সরস বিবরণ দেওয়া রয়েছে। বৃটিশ আমলের পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যাবে কি অবস্থা ছিল ঐ সময়। “১৮৫৩ তে কলকাতা শহরে ৪০৪৯ টি বেশ্যাগৃহ ছিল যাতে বাস করছিলেন ১২,৪১৯ জন যৌনকর্মী। ১৮৬৭ তে ছিল ৩০,০০০ জন॥ ১৯১১ সালের আদশুমারি অনুযায়ী ১৪২৭১ জন। ১৯২১ সালের আদম শুমারিতে অনুযায়ী ১০,৮১৪ জন যৌনকর্মী ছিল কলকাতায়। [তথ্যসুত্র: দেবাশিস বসু, ‘কলকাতার যৌনপল্লী’, সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত ,বার্ষিক সংকলন ৫,২০০১]” কিন্তু প্রকৃত সংখ্যা হয়তো আরো বেশী হবে। “কলকাতায় খুবই রমরমা ছিল বেশ্যাদের জগৎ। গৃহস্থের বাড়ির পাশে বেশ্যা, ছেলেদের পাঠশালার পাশে বেশ্যা, চিকিৎসালয়ের পাশে বেশ্যা, মন্দিরের পাশে বেশ্যা। [তথ্যসুত্র: বিনয় ঘোষ, কলকাতা শহরের ইতিবৃত্ত,১৯৯৯, পৃ. ৩০২-০৩]” “বিশেষ করে রামবাগান, সোনাগাছি, মেছোবাজার, সিদ্ধেশ্বরীতলা, হাড়কাটা, চাঁপাতলা, ইমামবক্স এগুলো ছিল বেশ্যাদের আখড়া॥ [তথ্যসুত্র: বিশ্বনাথ জোয়ারদার, পুরনো কলকাতার অন্য সংস্কৃতি,২০০৯, পৃ. ৩৪-৩৮]” “এমনকি কিছু পতিতা শহরে প্রকাশ্য রাজপথে নৃত্য পর্যন্ত করতো। সাধারণ মানুষ পুলিশের কাছে আবেদন করা সত্ত্বেও এর কোনো প্রতিকার হয়নি। কারণ কলকাতার পুলিশ ধনীদের তৈরি বেশ্যালয় গুলোতে হস্তক্ষেপ করতে সাহস পেত না । শুধু মাত্র দ্বারকানাথ ঠাকুর কলকাতার একটি এলাকাতেই তেতাল্লিশটি বেশ্যালয়ের মালিক ছিলেন। আসলে নারীদের সবসময় ভোগের পন্যই মনে করা হয়েছে, ইংরেজ আমলেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। সমাজের নেতৃস্থানীয় খ্যাতিমান ব্যক্তিবর্গের কেউ কেউ এই নৈতিক স্খলন থেকে মুক্ত ছিলেন না । “বেশ্যাবাজি ছিল বাবু সমাজের সাধারণ ঘটনা। নারী আন্দোলনের ভারত পথিক রাজা রামমোহন রায়ের, রক্ষিতা ছিল॥ এমনকি ঐ রক্ষিতার গর্ভে তাঁর একটি পুত্রও জন্মে ছিল। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর পতিতা সুকুমারী দত্তের প্রেমে মজেছিলেন। সাহিত্যিক মীর মোশাররফ হোসেন নিয়মিত বেশ্যা পাড়ায় যেতেন তা তিনি নিজেই তার ডাইরিতে লিখে গেছেন॥ কথা শিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নিয়মিত পতিতালয়ে যেতেন। [ তথ্যসুত্র: অবিদ্যার অন্তঃপুরে, নিষিদ্ধ পল্লীর অন্তরঙ্গ কথকতা; ড. আবুল আহসান চৌধুরী : শোভা প্রকাশ]” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও পতিতালয়ে যেতেন। নিষিদ্ধ পল্লীতে গমনের ফলে রবীন্দ্রনাথের সিফিলিস আক্রান্ত হওয়ার খবর তার জীবদ্দশাতেই ‘বসুমতী’ পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছিল । যাইহোক এইরকম আরো অনেকেরই আছে তাদের কথা আর নাইবা লিখলাম। “শুধু তাই নয় সেই সময় ইংরেজ সৈন্যরা মাত্রাতিরিক্ত পতিতালয়ে যেতো। যার ফলে ১৮৬০ সালে ইংরেজ সৈন্যদের মধ্যে ৬০% এর বেশী যৌনরোগে আক্রান্ত হয়ে পরে। তাই ইংরেজ সরকার ১৮৬৪ সালে পাশ করালেন – (Cantonment Act) আইন। সেনা ছাউনি গুলোতে ইংরেজ সৈন্যদের জন্য তৈরি হল আলাদা বেশ্যালয়, সেখানে যেসব বেশ্যারা আসতেন তাঁদের রেজিস্ট্রি ভুক্ত করে পরিচয় পত্র দেওয়া হত। যৌনরোগ থেকে তাঁদের মুক্ত রাখার জন্য ‘লক হসপিটাল’ নামে বিশেষ হাসপাতাল স্থাপন করা হয় প্রধান সেনা ছাউনিতে । মোঘল সম্রাট আকবরের শাসনামল থেকেই যশোর শহরে চলে আসছে পতিতাবৃত্তি। ব্রিটিশ যুগে যশোর শহরের তিনটি স্থানে পতিতালয় ছিল । কলকাতার জমিদার মনমত নাথ রায় ঘোড়া গাড়ি করে প্রতি শনিবার আসতেন ফুর্তি করতে। আর সে সময়ে তাকে মেয়ে সাপ্লাই দিতো চাঁচড়া রায় পাড়ার ব্রাহ্মণ পরিবার থেকে। বর্তমান আমাদের দেশে পতিতারা রয়েছে অনেকটা সংজ্ঞাহীন নাগরিক হিসেবে। এক হিসাব মতে দেশে মোট ৭৪৩০০ পতিতা রয়েছে। যার মধ্যে ৩০৭০০ জন ভাসমান পতিতা । আমাদের দেশে এখন সাধারণত চার ধরণের যৌন কর্মী রয়েছে….
ক) যৌনপল্লী বেইজ সেক্স ওয়ার্কার
খ) রেসিডেন্স বেইজ সেক্স ওয়ার্কার
গ) হোটেল বেইজ সেক্স ওয়ার্কার
ঘ) স্ট্রিট বেইজ সেক্স ওয়ার্কার।

যার মধ্যে স্ট্রিট বেইজ কর্মীরা যেমন অসুরক্ষিত তেমনি জড়িত নানা ধরণের অপরাধ কর্মকান্ডের সাথে। পতিতাবৃত্তির ইতিহাস যথেচ্ছাই পায়চারী করলে একথা অনুধাবনযোগ্য যে সমাজের আদিম অবস্থায় আজকের মতো পরিবার প্রথা ছিল না । মানুষ দলবদ্ধভাবে বাস করতো। মর্গানের মতে, এক একটা গোষ্ঠীর মধ্যে অবাধ যৌন মিলন চলতো । সেখানে প্রত্যেক পুরুষেরই প্রত্যেক নারীর উপর সমান অধিকার ছিল, আবার প্রত্যেক নারীরও প্রত্যেক পুরুষের উপর সমান অধিকার ছিল । অবশ্য অবাধ যৌন মিলনের স্তর এতই সুদূর অতীত হয়ে গেছে যে বর্তমানে তার শেষ চিহ্নটিও আবিস্কার করে প্রত্যক্ষ প্রমাণ উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। তাছাড়া আজকের মানুষ সভ্যতার যে স্তরে পৌঁছেছে তাতে অবাধ যৌন মিলনের স্তর সম্পর্কে বলতে এখন লজ্জা পায় । যাই হোক তারপরেই মানুষ পদার্পণ করেছিল যৌথ বিবাহের যুগে । বাকোফেন এ বিষয়ে সর্বপ্রথম গুরুত্ব দিয়ে গবেষণা করেন এবং ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে থেকে এর প্রমাণও হাজির করেছেন। যৌথ পরিবার ব্যবস্থায় নারীদের প্রাধান্য ছিল। কারণ উক্ত ব্যবস্থায় সন্তানের বাবা কে তা বুঝতে পারা অসম্ভব ছিল, কিন্তু মাকে চিনতে ভুল হত না । সে সময় অনেক দম্পতি তাদের সন্তান-সন্ততি নিয়ে একত্রে বসবাস করতো, সেখানে নারী যে ঘর-সংসার দেখাশোনার কাজ করতো তা পুরুষের খাদ্য সংগ্রহের কাজের সমান সামাজিক প্রয়োজন বলে বিবেচিত হত। তারপর মানব পরিবারের ক্রমবিকাশের পরবর্তী স্তরে আর যৌথ পরিবার প্রথা টিকলো না। যৌন সম্পর্কের আওতা থেকে প্রথমে নিকটতম লোকদের তারপর একটু দূর সম্পর্কের আত্মীয়দের বাদ দিতে থাকায় যৌথ পরিবার প্রথা লোপ পেল । অবশেষে একজোড়া নর-নারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেল পরিবার। বিশ্বের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীসমূহের পারিবারিক সংস্কৃতি বিশ্লেষণ করলে এখনও এসব তথ্যের প্রমাণ পাওয়া যায় । বলা যেতে পারে যে একবিবাহ প্রথা প্রবর্তনের পেছনে নিয়ামক হিসেবে প্রধান ভূমিকা ছিল ব্যক্তিগত সম্পত্তির আবির্ভাব ।
পরিবর্তিত উৎপাদন ব্যবস্থার দ্বারা সৃষ্ট অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে অর্থাৎ সম্পত্তির উপর যৌথ অধিকারের স্থলে ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলেই একবিবাহমূলক পরিবার প্রথার উদ্ভব হয়েছে। সুতরাং অবাধ যৌন মিলনের যুগে এবং যৌথ পরিবারের যুগে নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো লিঙ্গ বৈষম্য ছিল না । লিঙ্গ বৈষম্য শুরু হয়েছে পুরুষরা যখন থেকে একচেটিয়া সম্পত্তির মালিক হয়েছে এবং তখন থেকেই একবিবাহমূলক পরিবার প্রথার প্রচলনও ঘটেছে । উহাই ছিল নারী জাতির ঐতিহাসিক মহা পরাজয় । সে সময় থেকেই ঘর সংসারের কাজকে আর সামাজিক কাজ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না, সাংসারিক কাজকর্মগুলো তখন হয়ে দাঁড়ায় ব্যক্তিগত বিষয়। হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করলেও তা মূল্যায়িত হয় না । স্ত্রী হয়ে দাঁড়ায় পারিবারিক দাসী, বঞ্চিত হয় ধনসম্পদের মালিকানা থেকে। ঠিক ওই সময় থেকেই মেয়েদেরকে নামানো হয়েছে বেশ্যাবৃত্তিতে, যা সম্পূর্ণভাবে পুরুষ আধিপত্যের দ্বারা সৃষ্ট । পুরুষ যখন চেয়েছে উত্তরাধিকারী হিসেবে তার সম্পদ যেন নিজের নির্দিষ্ট সন্তান ছাড়া আর কেহ না পায়, তখনই তারা একবিবাহ প্রথার প্রবর্তন করেছে। কাজেই শুরু থেকেই একবিবাহ বাধ্যতামূলক শুধু নারীর জন্যে, মোটেই তা পুরুষের জন্যে নয়। দলগত বিবাহ প্রথার যৌন স্বাধীনতা শুধু নারীরাই হারালো, পুরুষদের বেলায় তা হলো না। ফলে তখন থেকেই পুরুষের জন্যে একাধিক স্ত্রীর রাখার বৈধতার পাশাপাশি গোপনে বা প্রকাশ্যে বহুপত্নী ব্যবহারে অথবা বেশ্যার ব্যবহারের প্রচলন চলে আসছে । ঘরের স্ত্রীর যৌনাঙ্গে লোহার বেড়ি পরিয়ে তালাবদ্ধ করে আটকিয়ে রেখে পুরুষের বিভিন্ন যায়গায় যৌনকর্ম করে বেড়ানোর ইতিহাস বেশি দিনের পুরোনো নয়। বাস্তবিক পক্ষে পুরুষদের ক্ষেত্রে আজও কিছুটা দলগত বিবাহ প্রথা বিদ্যমান, যা নারীর জন্য নয়। তাই একাধিক পুরুষের সাথে নারীর যৌনতাকে অপরাধ বলে গণ্য করা হয় এবং যার জন্য আইনের দৃষ্টিতে, ধর্মীয় রীতিতে এবং সমাজের কাছে তাদের কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হয় অপরপক্ষে পুরুষের ক্ষেত্রে তাহলো সম্মানের কাজ, যদিও কোনো কোনো সময় উহা পুরুষের নৈতিক পদস্খলন হিসেবে দেখা হয় তবে হাসি মুখেই তা মেনে নেওয়া হয় । একই কারণে অভিধানে ‘পতিতা’ শব্দটি থাকলেও ‘পতিত’ নামক কোনো শব্দ নেই এবং থাকার কথাও নয়। সুতরাং ঐতিহাসিকভাবে ইহাই প্রতিষ্ঠিত এবং বাস্তব সত্য এই যে, যখন থেকে একবিবাহ প্রথার উদ্ভব হয়েছে তখন থেকেই স্ত্রীর পাশাপাশি বেশ্যারও সৃষ্টি হয়েছে। এঙ্গেলস তাঁর ‘পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’ নামক বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থে বলেছেন, “বেশ্যাদের থেকে সেই স্ত্রীর পার্থক্য কেবল এই যে, সে সাধারণ বেশ্যাদের মতো রোজই নিজের দেহকে দিন-মজুরের মতো ভাড়া খাটায় না, কিন্তু তার দেহকে সে একেবারেই চিরকালের দাসত্বে বিক্রি করে দেয়।” কিন্তু এত কিছুর পরেও সন্দেহাতীত ভাবে বলা যায় যে, একবিবাহ প্রথার উদ্ভব ছিল সভ্যতার ক্রমবিকাশের পথে একধাপ অগ্রগতি । তাই এঙ্গেলসও মনে করতেন যে, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হলে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হবে প্রেমময় এবং মধুর, থাকবে না কোনো লিঙ্গ-বৈষম্য । যাইহোক পতিতাবৃত্তি চলে আসছে লক্ষাধিক বছর পূর্বে থেকে এবং ধর্মগুলি এসেছে মাত্র দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজার বছর পূর্বে । লক্ষ্য করার বিষয় এই যে যদিওবা কোন ধর্মই এই ব্যবস্থাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন না করে এসেছে তবুও সময়ের আবর্তে কখনো ক্রীতদাসীর সাথে যৌনকর্মের পক্ষে কিংবা নারীর দেহ বিক্রয় করার অর্থ মন্দিরের তহবিলে জমা হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। আর্মেনিয়ার আনাইতিস দেবতার মন্দিরের ক্রীতদাসীরা, করিন্থের আফ্রোদিতে দেবতার মন্দিরের ক্রীতদাসীরা, ভারতীয় মন্দিরসমূহের নর্তকীরা, পর্তুগীজ বায়াদের নর্তকীরা এক সময় ছিল দুনিয়ার সেরা বেশ্যা । এভাবে যুগের পর যুগ, শতাব্দির পর শতাব্দি, সহস্রাব্দের পর সহস্রাব্দ ধরে চলে আসছে পতিতাবৃত্তি । এক কথায় বলা যেতে পারে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক দিক দিয়ে নারী ও পুরুষের মাঝে বিরাজমান বৈষম্যের এক চরম শোচনীয় পরিণতির নাম হচ্ছে পতিতাবৃত্তি । ভারতেও সেই ধারাবাহিকতা যথারীতি চলে আসছে বহুবছর ধরে । এদেশে বহু পতিতালয় ছিল এবং এখনও বেশ কিছু রয়েছে । তবে শঙ্কার বিষয়, পতিতালয়ের সংখ্যা দিন দিন কমলেও পতিতার সংখ্যা কিন্তু বেড়েই চলছে ।
_______________________________সংগৃহীত

ছবি। সায়ন মদোক।


কিছু কথা

Try to read:-

জাপানে পড়তে যাওয়া এক ছাত্রী  একদিন ফোনে বললো- দিদি , বড়ই লজ্জায় আছি।
কেন কি হয়েছে ?
ড্রইং ক্লাসে ড্রইং বক্স নিয়ে যাইনি।
তো?
জাপানী স্যার বড় একটা শিক্ষা দিয়েছেন।
কি করেছেন ?
আমার কাছে এসে  ক্ষমা চেয়েছেন। বলেছেন আজ যে ড্রইং বক্স নিয়ে আসতে হবে তা স্মরণ রাখার মত জোর দিয়ে আমাকে বুঝিয়ে বলতে পারেন নি। তাই তিনি  দুঃখিত।
হুম।
আমি তো আর কোন দিন ড্রইং বক্স নিতে ভুলবো না, দিদি  । আজ যদি তিনি  আমাকে বকা দিতেন  বা অন্য কোন শাস্তি দিতেন আমি কোন একটা মিথ্যা অজুহাত দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করতাম।

জাপানী দল বিশ্বকাপে হেরে গেলেও জাপানী দর্শকরা গ্যালারী পরিষ্কার করে স্টেডিয়াম ত্যাগ করেন। এ কেমন কথা? এটা কি কোন পরাজয়ের ভাষা! হেরেছিস- রেফারীর গুষ্টি তুলে গালি দে- বলে দে পয়সা খেয়েছে। বিয়ারের ক্যান, কোকের ক্যান, চিনাবাদামের খোসা যা পাস ছুঁড়ে দে। দুই দিন হরতাল ডাক। অন্তত বুদ্ধিজীবিদের ভাষায় এটা তো বলতে পারিস যে খেলোয়াড় নির্বাচন ঠিক হয়নি- সরকারের অথবা বিরোধী দলের হাত আছে।
--

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে হেরে গিয়ে জাপানের সম্রাট হিরোহিতো আমেরিকার প্রতিনিধি ম্যাক আর্থারের কাছে গেলেন। প্রতীকি আইটেম হিসাবে নিয়ে গেলেন এক ব্যাগ চাল। হারাকিরি ভঙ্গিতে হাঁটু  গেড়ে মাথা পেতে দিয়ে বললেন- আমার মাথা কেটে নেন আর এই চাল টুকু গ্রহণ করুন। আমার প্রজাদের রক্ষা করুন। ওরা ভাত পছন্দ করে। ওদের যেন ভাতের অভাব না হয়।

আরে ব্যাটা তুই যুদ্ধে হেরেছিস তোর আত্মীয় স্বজন নিয়ে পালিয়ে যা। তোর দেশের চারিদিকেই তো জল । নৌপথে কিভাবে পালাতে হয় আমাদের ইতিহাস (লক্ষণ সেন) থেকে শিখে নে। কোরিয়া বা তাইওয়ান যা। ওখানকার মীর জাফরদের সাথে হাত মেলা। সেখান থেকে হুংকার দে।
সম্রাট হিরোহিতোর এই ক্যারেক্টার আমেরিকানদের পছন্দ হলো। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কুখ্যাত মহানায়কদের মধ্যে কেবলমাত্র হিরোহিতোকে বিনা আঘাতে বাঁচিয়ে রাখা হলো।
--

--
২০১১ সালের ১১ই মার্চ। Tsunami র আগাম বার্তা শুনে এক ফিশারি কোম্পানীর মালিক সাতো সান প্রথমেই বাঁচাতে গেলেন তার কর্মচারীদের। হাতে সময় আছে মাত্র ৩০ মিনিট। প্রায়রিটি দিলেন বিদেশি (চাইনিজ) দের। একে একে সব কর্মচারীদের অফিস থেকে বের করে পাশের উঁচু টিলায় নিজ হাতে রেখে এলেন। সর্বশেষে গেলেন তার পরিবারের খোঁজ  নিতে। ইতিমধ্যে Tsunami সাহেব এসে হাজির। সাতো সানকে চোখের সামনে কোলে তুলে ভাসিয়ে নিয়ে গেলেন। আজও খোঁজ হীন হয়ে আছেন তার পরিবার। ইসস -সাতো সান যদি প্রমোটর মালিকের সাথে একটা বার দেখা করার সুযোগ পেতেন ।
সাতো সান অমর হলেন চায়না তে। চাইনিজরা দেশে ফিরে গিয়ে শহরের চৌরাস্তায় উনার প্রতিকৃতি বানিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন।
--
নয় বছরের এক ছেলে। স্কুলে ক্লাস করছিল। Tsunami-র আগমনের কথা শুনে স্কুল কর্তৃপক্ষ সব ছাত্রদের তিন তলায় জড়ো করলো। তিন তলার ব্যালকনি থেকে দেখলো তার বাবা আসছে গাড়ি নিয়ে। গাড়িকে ধাওয়া করে আসছে ফোসফোসে জলের সৈন্য দল। গাড়ির স্পিড জলে র স্পিডের কাছে হার মেনে গেলো। চোখের সামনে নাই হয়ে গেল বাবা। সৈকতের নিকটেই ছিল তাদের বাড়ী । মা আর ছোট ভাই ভেসে গেছে আরো আগে। পরিবারের সবাইকে হারিয়ে ছেলেটি আশ্রয় শিবিরে উঠলো। শিবিরের সবাই ক্ষুধায় আর শীতে কাঁপছে। ভলান্টিয়াররা রুটি বিলি করছেন। আশ্রিতরা লাইনে দাড়িয়ে আছেন। ছেলেটিও আছে। এক বিদেশী সাংবাদিক দেখলেন, যদ্দুর খাদ্য (রুটি) আছে তাতে লাইনের সবার হবেনা । ছেলেটির কপালে জুটবে না। সাংবাদিক সাহেব তার কোট পকেটে রাখা নিজের ভাগের রুটি দুটো ছেলেটিকে দিলেন। ছেলেটি ধন্যবাদ জানিয়ে রুটি গ্রহন করলো। তারপর যেখান থেকে রুটি ডিস্ট্রিবিউশন হচ্ছিল সেখানেই ফেরত দিয়ে আবার লাইনে এসে দাঁড়াল।

 সাংবাদিক সাহেব কৌতুহল ঢাকতে পারলেন না। ছেলেটিকে জিজ্ঞাস করলেন - এ কাজ কেন করলে খোকা? খোকা উত্তর দিল- বন্টন তো ওখান থেকে হচ্ছে। উনাদের হাতে থাকলে বন্টনে সমতা আসবে। তাছাড়া লাইনে আমার চেয়েও বেশী ক্ষুধার্ত লোক থাকতে পারে।
সহানুভুতিশীল হতে গিয়ে বন্টনে অসমতা এনেছেন- এই ভেবে সাংবাদিক সাহেবের পাপবোধ হলো। এই ছেলের কাছে কি বলে ক্ষমা চাইবেন ভাষা হারালেন।
--
যাদের জাপান সম্পর্কে ধারণা আছে তারা সবাই জানেন...যদি ট্রেনে বা বাসে কোন জিনিস হারিয়ে যায়, অনেকটা নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন, ঐ জিনিস আপনি অক্ষত অবস্থায় ফেরত পাবেন। গভীর রাতে কোন ট্রাফিক নেই, কিন্তু পথচারী ঠিকই ট্রাফিক বাতি সবুজ না হওয়া পর্যন্ত পথ পার হচ্ছেন না। ট্রেনে বাসে টিকিট ফাঁকি দেয়ার হার (%) প্রায় শুন্যের কোঠায়। একবার ভুলে ঘরের দরজা লক না করে এক ভারতীয়  দেশে গেলেন মাস খানেক পর এসে দেখেন, যেমন ঘর রেখে গেছেন, ঠিক তেমনই আছে।

এই শিক্ষা জাপানীরা কোথায় পায়?

সামাজিক শিক্ষা শুরু হয় কিন্ডারগার্টেন লেভেল থেকে। সর্বপ্রথম যে তিনটি শব্দ এদের শিখানো হয় তা হলো-
কননিচিওয়া (হ্যালো) - পরিচিত মানুষকে দেখা মাত্র হ্যালো বলবে।
আরিগাতোউ (ধন্যবাদ) - সমাজে বাস করতে হলে একে অপরকে উপকার করবে। তুমি যদি বিন্দুমাত্র কারো দ্বারা উপকৃত হও তাহলে ধন্যবাদ দিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে।
গোমেননাসাই (দুঃখিত) - মানুষ মাত্রই ভুল করবে এবং সেই ভুলের জন্য ক্ষমা চাইবে।

এগুলো যে শুধু মুখস্ত করে শেখানো হয় তা না। বাস্তবে শিক্ষকরা প্রো-এক্টিভলি সুযোগ পেলেই ব্যবহার করবেন এবং করিয়ে ছাড়বেন।
সমাজে এই তিনটি শব্দের গুরুত্ব কত তা নিশ্চয়ই অনুধাবন করতে পারছেন। এই শিক্ষাটা এবং প্রাকটিস ওরা বাল্যকাল থেকে করতে  শেখে। আমাদের রাজনীতিবিদরা বাল্যকালটা যদি কোন রকমে জাপানের কিন্ডারগার্টেনে কাটিয়ে আসতে পারতেন।

কিন্ডারগার্টেন থেকেই স্বনির্ভরতার ট্রেনিং দেয়া হয়। সমাজে মানুষ হিসাবে বসবাস করার জন্য যা দরকার - নিজের বই খাতা, খেলনা, বিছানা নিজে গোছানো; টয়লেট ব্যবহার, পরিষ্কার করা; নিজের খাবার নিজে খাওয়া, প্লেট গোছানো ইত্যাদি। প্রাইমারী স্কুল থেকে এরা নিজেরা দল বেধে স্কুলে যায়। দল ঠিক করে দেন স্কুল কর্তৃপক্ষ। ট্রাফিক আইন, বাস ট্রেনে চড়ার নিয়ম কানুন সবই শিখানো হয়। আপনার গাড়ি আছে, বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে আসবেন, উল্টে  আপনাকে লজ্জা পেয়ে আসতে হবে।

ক্লাস সেভেন থেকে সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যেতে পারবে। ক্লাসে কে ধনী, কে গরীব, কে প্রথম কে দ্বিতীয় এসব বৈষম্য যেন তৈরী না হয় তার জন্য যথেষ্ট সতর্ক থাকেন স্কুল কর্তৃপক্ষ। ক্লাসে রোল নং ১, মানে এই নয় যে একাডেমিক পারফরম্যান্স সবচেয়ে ভাল। রোল নং তৈরী হয় নামের বানানের ক্রমানুসারে।

বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগীতার সমস্ত আইটেম গুলো থাকে গ্রুপ পারফরম্যান্স দেখার জন্য - ইন্ডিভিজুয়েল নয়। সারা স্কুলের ছেলে মেয়েদের ভাগ করা হয় কয়েকটা টা গ্রুপে- সাদা দল, লাল দল, সবুজ দল ইত্যাদি। গ্রুপে কাজ করার ট্রেনিংটা পেয়ে যায় খেলাধুলা জাতীয় এক্টিভিটি থেকে। এই জন্যই হয়তো জাপানে বড় লিডার তৈরি হয়না কিন্তু গড়ে এরা সবার সেরা। 

তোমার বোতাম হীন জামা

তোমার বোতাম হীন জামা
রাজিত বন্দোপাধ্যায় ।

মুখ থুবড়ে পড়েছে দেখছো না রাজনীতি !
চারিদিকে আজ --
হ্রিংসতার জ্বলন্ত অঙ্গার ।
ধর্ম হেরে গেলে ধর্ষণের মুখে --  
হাজার সম্পত্তি আগুনে ফুঁকে  
কর সমর্থন ভক্ত বলে  ।
রাজনেতা করে গেছে মোলাকাত ,
যাক না স্বাধ্বী ;  
হত্যা হোকনা তার সহোদর ।
বাবার মাফি কমে নাকি তাতে !
সতীত্ব ভাঙায় মাফি  
রাজনেতার সহোদর , ভাইপো ,  ভাইঝি
কোথায় নেই মাফি ?
একজন কে দিলে সাজা --  
এক গুচ্ছ মাফি গজিয়ে ওঠে !
পর ধন আত্মসাৎ- এ --
দেখছো না , রাজনীতি দেয় হামা  
তোমার বোতাম হীন জামা !
রাজনীতি হা ডু- ডু খেলে
নিয়ে তোমার ভোট !  
ভেঙ্গে গড়ে খেলে যায় রাজনীতি ,
নিশ্চিন্তে দলের জোট ।
আমি তুমি ভেড়া , ঐ পালের --  
কাজ হলে সারা --- ফোট !!  

মায়ামঞ্চে

মায়ামঞ্চে


তাকালেই দুচোখ ভরে যায় নিসর্গ সমারোহে
সমস্ত ভাবনাগুলো তৃপ্তি দেয়-নিষ্পাপ প্রেমিকের মনে।
নিতান্ত কাঙ্গাল আমি লুব্ধতার স্বভাবে
জন্ম নেওয়া স্বপ্নগুলো বড়ো হয় সময়ের হাত ধরে।

উন্মত্ত বাতাসের আক্রোশে ছোবল মারে রূপকথার অজগর--
অনির্দিষ্ট লক্ষ্যের পিছনে ছন্নছাড়া স্বপ্নগুলো তারপর-

যেহেতু এসিড বৃষ্টি হয়েছিল ঘড়ির কাঁটার উপর,
সমস্ত রহস্য-রহস্য থেকে যায় শুধু দমের উপর'
দু' দণ্ড দাঁড়ায় আমি অশ্রুসজল ভবঘাটে
মৌন রহস্য! সন্ন্যাসী সূর্যের দৃষ্টিতে;
পূবে জেগে ওঠে কর্মসুখ,সূর্যাস্তের রঙ পশ্চিম আকাশে
মূর্তিহীন ঈশ্বরের ছবি--
মনে পড়ে গভীর আঁধারে।


জয়ন্ত ব্যানার্জি

ডাকটিকিট বা স্টাম্প

ডাকটিকিট বা  স্টাম্প                                                        পৃথিবীতে প্রথম কি ভাবে প্রচলন হলো আর কেমন ছিলো  *********...