Ratna Chakraborty
পৃথা বিয়েটাতে রাজী হল শুধু বাচ্চাটার জন্য।পৃথার বয়স এখন আটত্রিশ। কিন্তু দেখলে ত্রিশের বেশী মনে হয় না।পৃথা শিক্ষিতা,সুন্দরী।বাবার অবস্থা ভালো।নিজে একটা নামী কিন্ডারগার্টেন স্কুলে চাকরী করে।এতদিন কেন যে বিয়ে হয়নি তার একটা বড় কারণ আছে। সেটা হল পৃথার ২৫ বছর বয়েসে ওর ওভারীতে টিউমার ধরা পরে।বড় নামী ডাক্তার দিয়ে অপারেশন করান পুলক বাবু।কিন্তু অপারেশনের পর জানা যায় পৃথা কোনোদিনও মা হতে পারবে না।বাবা মা প্রচুর সম্বন্ধ দেখেছেন।কিন্তু ওই একটি বিষয়ে সবাই ঠেকে যায়।আফটার অল পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা।দেখে দেখে বিরক্ত হয়ে উঠেছিল পৃথাও।কেউ কেউ যে রাজী হয়নি তাও নয়।কিন্তু পৃথা কথাবার্তা এগোতে বুঝেছে তাদের বেশীর ভাগের টান পৃথার বাবার ব্যাঙ্কব্যলেন্সের উপর।পৃথা নিজেই না করে দিয়েছিল।এরপর পৃথা জানিয়ে দেয় যে সে বিয়ে করবেই না।বিয়েটা কি জীবনে এতটাই ইম্পর্ট্যান্ট যে নিজেকে অসম্মান করে তুলা যন্ত্রে চড়িয়েও বিয়ে করতেই হবে।মা বলতেন-"এখন বুঝছিস না।কিন্তু বুড়ো বয়েসে আমরা চোখ বুজলে...একটা সঙ্গী লাগে মা।"পৃথাকে না জানিয়ে ভিতরে ভিতরে সম্বন্ধ খুঁজছিলেন তারা।পেয়ে গেলেন।এই পাত্রের শর্তটাই হল মা হতে চাইবে না এমন পাত্রী।কারণ পাত্র বিপত্নীক। একটা মেয়ে আছে সাত বছরের।এতদিন ঠাকুমার কাছেই মেয়েটা বড় হয়েছে।কিন্তু সেরিব্রাল এটাকে ঠাকুমা বিছানা নেওয়ায় মেয়েটার দেখাশুনা করার কেউ নেই।না,কাজের লোক আয়া প্রচুর আছে।কিন্তু আপনজন নেই।ভদ্রলোক মানে মেয়েটার বাবা ব্যবসা নিয়ে অত্যন্ত ব্যস্ত।আজ হংকং কাল সিঙ্গাপুর করে বেরান।মেয়েটার আয়া নয়,মায়ের প্রয়োজন।তাই বিয়ের ইস্তেহার দিয়েছিলেন ওনারা।অনেক বলে কয়ে পৃথাকে রাজী করানো হল দেখা করতে।এখন তো আর পাত্রী সং সেজে পাত্রের সামনে বসে না।ওরা বাইরের রেস্তোরায় দেখা করল।পৃথার দিদি সঙ্গে ছিলেন।আর পাত্র মানে অভীকের মামাতো ভাই সঙ্গে এসেছিল।অভীক মেয়ে মিঠিকেও সঙ্গে করে এনেছিল।সবাই বলেছিল -"কি দরকার প্রথমেই.."অভীক কিন্তু চেয়েছিল উভয়ের কাছে শুরু থেকেই উভয় পরিষ্কার থাকতে।পৃথার খুব ভালো লেগেছিল মিঠিকে।পৃথার ভিতরে যে মাতৃত্বের আকাঙখাকে সে গলা টিপে চুপ করিয়ে রেখেছিল মিঠিকে দেখে সেটা আবার জেগে উঠল।কিন্ডারগার্টেন স্কুলে সে রোজ কচি কচি মুখগুলোর মধ্যে যেটা খোঁজে এই মেয়েটা পারবে তাকে সেটা দিতে।একটা ডাক-"মা"।কে বলল সে মা হতে পারবে না।অভীক মানুষটিকেও খারাপ লাগল না।ভদ্র মার্জিত,লাজুক।সাত বছর আগে স্ত্রী হারিয়ে নিজেকে কাজে ডুবিয়ে নিয়েছিলেন।মেয়ের দিকে তাকানোর তেমন সময় হয় নি।কিন্তু কর্তব্য করেছেন সব।বেশ স্পষ্ট করেই অভীক বলেছেন বিয়ে হলে তার নিজের স্ত্রীর চেয়েও মিঠির মা হিসেবে পৃথাকে তিনি দেখতে চাইবেন অনেক বেশী।পৃথাও জানিয়েছে মা হবার সুযোগ পাচ্ছে বলেই সে বিয়েতে এগোচ্ছে।নইলে হয়ত বিয়ে ব্যাপারটার প্রতি তেমন আকাঙ্ক্ষা তারও আর নেই।
বিয়েটা রেজিস্ট্রি করেই করেছিল ওরা।মেয়ের কথা ভেবে পৃথাই প্রস্তাবটা দিয়েছিল।আসলে মেয়ে বড় হচ্ছে।সে কিভাবে নেবে বাবার বিয়ে সেটা নিয়ে একটু টেনশানে ছিল পৃথা।কিন্তু দেখা গেল মেয়েটা অখুশী হয়নি।আসলে ও তো জন্মে ওর মাকে দেখেনি তাই বোধহয় পৃথাকে বাবার বৌ ভাবতে তার অসুবিধা হল না।সে উলটে একটা লেহেঙ্গা কিনল বিয়েতে।পৃথার অবশ্য এইটুকু বাচ্চা মেয়ের লেহেঙ্গা পরা মোটেই ভালো লাগে না।ওসব পরার জন্য ঢের বয়েস পরে আছে।পৃথা বিয়ের পরই রিসেপশানের আগে বেবিল্যান্ডে গিয়ে মিঠির জন্য অনেকগুলো বেবি ফ্রক কিনল।পরলে মিঠিকে পরী লাগবে।মিঠির সঙ্গে এখনও তেমন ভাব জমানো হয় নি পৃথার।বিয়ের পর বাড়িতে আসার পর শুধু মিঠি বলেছিল -"তোমাকে নতুন বৌএর মত দেখতেই না।পচা।"আসলে ও ভেবেছিল বেনারসি চন্দন পরা বৌ নিয়ে আসবে বাবা।কিন্তু মেয়ের চোখে লাগবে ভেবেই পৃথা নর্মালি একটা দামী চান্দেরি পরেছিল। খোঁপায় জুঁইএর মালা আর কপালে লাল টিপ পরেছিল।মিঠির এক্সপেকটেশন মেলে নি।সবাই হেসেই ফেলেছিল মিঠির কথায়।পৃথাও হেসেছিল।পাকা বুড়ি একটা।
ভাব জমাতে মিঠির ঘরে জামাগুলো নিয়ে গেল পৃথা।মিঠি ওকে দেখে বলল-"বৌ মা এসেছ।ওকে এসো।"বৌ মা!এ আবার কেমন ডাক।পৃথা জানে মিঠি তার মাকে দেখে নি।সুতরাং পৃথাকে মা বলতে কোন অসুবিধা হবার কথা তো নয়।তবে এমন অদ্ভুত ডাক ডাকছে কেন ও?ওর ঠাকুমাকে নকল করছে?মা নিয়ে যদি অবচেতন কোন সমস্যা থাকে তবে না হয় মামনি ডাকুক।পৃথা বলে-"বৌ মা আবার কি।তুমি মা বলবে আমায়।ঠিক আছে।"মিঠি ঘাড় নাড়ে।পৃথা ওর হাতে জামাগুলো দেয়। ফোকলা হাসি হেসে মিঠি জামাগুলো বার করে।কিন্তু জামা গুলো দেখে নাক সিঁটকে সরিয়ে দেয়।বলে-"আমি কি বেবি।এসব জামা পড়ব না।আমি তো লেহেঙ্গা পরব কারিনার মত।"বিশ্রী লাগে পৃথার কানে।এই টুকু মেয়ে এসব শেখে কোত্থেকে?আসলে কাজের লোকেদের কাছে মানুষ তো,তাই এসব কারিনা টারিনা শিখেছে।পৃথাকে এই মাটির তাল কে প্রপার শেপে আনতে খাটতে হবে।পৃথা বলে-"না মিঠি ওগুলো পচা।এগুলো পড়লে তোমায় ডলের মত লাগবে।"মিঠি মাটিতে নেমে পা ঠুকে বলে-"না,আমি লেহেঙ্গা পরবই।"পৃথার মনে হল বড্ড জেদী মেয়ে।আসলে মা মরা মেয়ে তো তাই জেদ এতো।বেশী আদরে মানুষ হলে যা হয়।পৃথা কথা বাড়ালো না।
পরেরদিন রিসেপশানে মিঠি লেহেঙ্গাই পরল।পৃথা অভীককে আগে থেকে বলে রেখেছিল যে ফুলসজ্জা এসব যেন না করা হয়।পৃথা চায় মেয়ে বাবা মা দুজনের মাঝখানে শোবে।বাচ্চার আলাদা ঘরে শোবার পক্ষপাতী সে নয়।এতে বাবা মায়ের সাথে মেন্টাল এটাচমেন্ট তৈরি হয় না। কিন্তু মিঠিকে কিছুতেই রাজী করানো গেল না।সে তার টেডি টুডু বার্বি নিয়ে তার নার্সারি রুমে শুতে চায়।সেখানে হালকা গান চলে আর সে ঘুমিয়ে যায়।পৃথা বলে-"মিঠি আমি তোমায় আরো ভালো গান শোনাবো।"পৃথার গানের গলা মিষ্টি।কিন্তু একটু ঘুম পাড়ানি গান শুনে উঠে বসে মিঠি।বলে-"কি বিচ্ছিরি পচা সুর।এটা আমি শুনি না।"প্রায় বায়না করেই নিজের ঘরে শুতে যায় মিঠি।পৃথার কল্পনায় একের পর এক আঘাত লাগে।মনে মনে ভাবার চেষ্টা করে সময় লাগবে।বুনো অবাধ্য ঘোড়া।পোষ মানাতে সময় লাগবে।
পৃথা সকালে উঠে কর্ণফ্লেক্স রেডি করে নিজের হাতে।কাজের রান্নার মেয়েদের বলে দেয় আজ থেকে তারা বাড়ির অন্য কাজ করবে।মিঠির সব কাজ করবে পৃথা নিজে।কিন্তু খাবার টেবিলে আবার অপ্রিয় ঘটনা ঘটে।অন্যদের পরোটা দেখে মিঠি বায়না শুরু করে সেও পরোটা খাবে।পৃথা এবার ওর জেদকে গুরুত্ব দেয় না।প্রায় জোর করেই কর্নফ্লেক্স খাওয়ায়।মিঠি বলে-"বাজে মা, পচা মা।"পৃথা রাগ করে না।এই ভাবে ধীরে ধীরে সব পাল্টাতে হবে।
এতদিন মিঠি হারুদার কাঁধে চেপে ঘুরত।হারুদা বাগানের মালি।পৃথা অভীক কে বলল-"তুমি না একটুও মেয়েটাকে দেখ না।বড় হচ্ছে।মালির কাঁধে উঠবে।এটা ভালো দেখায়।তাছাড়া চারদিকে দেখছনা।কত খারাপ খারাপ ঘটনা ঘটছে।এসব মেলামেশা বেশী ভালো না।"অভীক বলে-"পৃথা হারুদা ওর জন্মের বিশ বছর আগে থেকে এবাড়িতে আছে।"পৃথা বলে-"আমি তো অস্বীকার করছি না।কিন্তু একটা সময় কন্যা সন্তানের বাবামাদের একটু খারাপ চিন্তাও করতে হয় অভীক।"
অভীক বোঝে পৃথা মিঠির ভালো চায়।পৃথাকে কিছু বলা মানে ওর আবেগকে আহত করা।কিন্তু মেয়েটা তো হারু দাকে বড্ড ভালোবাসে।পৃথা মিঠিকে পার্কে খেলতে নিয়ে যেতে চায়।মিঠি বলে সে হারুদার পিঠে ঘোড়া চরবে।কিছুতেই মিঠিকে বাগে আনতে পারে না পৃথা।মিঠিকে হারুদার সাথে খেলতে দেয় না বলে মিঠি ওর ঘরে গিয়ে দরজা দিয়ে বসে থাকে।পৃথা পুচকে মেয়ের দু:সাহস দেখে অবাক হয়ে যায়।মাঝখান থেকে হারু অপ্রস্তুত হয়।সে পৃথাকে বলতে আসে-"দিদিমণি আমি কি খুকীকে বুঝিয়ে দেখব।"অপমানে মুখ লাল হয়ে যায় পৃথার।সে মা যা পারছে না।হারু মালি সেটা পারবে।কিছু না বলে পৃথাও ঘরে চলে যায়।রাতে মিঠিকে অভীক বুঝিয়ে সুজিয়ে খাবার টেবিলে নিয়ে আসে।পৃথাও ভাবার চেষ্টা করে প্রথমেই হাল ছাড়লে চলবে না।মিঠি বেশী কিছু খেতে পারে না।বমি হয় ওর।পৃথা চিন্তায় পরে যায়।মিঠি বলে-"পচা মা সকালে আমায় কর্ণফ্লেক্স দিয়েছে তাই আমার বমি হচ্ছে।"অভীক বলে -"ছিঃ মিঠি ওকথা বলে না।"ডাক্তার আসে।বলে এসিড হয়ে গেছে।জিজ্ঞাসা করেন-"কি খেয়েছিল?"পৃথা চুপ করে থাকে।নিজেকে অপরাধী লাগে তার।ডাক্তার চলে গেলে রান্নার মাসি এসে কেঁদে ফেলে।বলে-"বৌরানী আমায় ক্ষমা কর।আজ সকালে বেবি যখন পরোটা খাবে বলে কাঁদল আমি ওকে একটা পরোটা দিয়ে ছিলুম।হয়ত সেই জন্যই।..."
পৃথা কিছু বলতে পারে না।কি ভাবে এরা? সে মিঠিকে খেতে দিতে চায় না?সে মিঠিকে কষ্ট দিতে চায়?প্রথম থেকেই সৎ মায়ের তকমাটা তার গায়ে এরা লাগিয়েই দিল।
নিজের শোবার ঘরের বারন্দায় এসে দাঁড়ায় পৃথা।অন্ধকার বারন্দায় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলে পৃথা।কিছুক্ষণ পর কাঁধে হাত রাখে অভীক।পৃথা নিজেকে সামলাবার চেষ্টা করে।অস্ফুটে অভীক বলে-"আই এম সরি।"অবাক হয়ে তাকায় পৃথা।অভীক বলে -"আমি জানি পৃথা তুমি কষ্ট পাচ্ছ।আর সেটা পাচ্ছ আমার ইচ্ছের মূল্য রাখতে।আমি চেয়েছিলাম তুমি আমার স্ত্রীর চেয়ে বেশী মিঠির মা হয়ে এসো।তুমিও সেটাই চেয়েছিলে।সেটাই চেষ্টা করেছিলে।তার জন্য শুরু থেকে শুধু সেক্রিফাইস করে চলেছ তুমি।তুমি মিঠির মা হয়ে মিঠির ভালো চেয়েছ।কিন্তু সেটা নিজের মত করে চেয়েছ।যেটা মিঠি মেনে নিতে পারছে না।হয়ত একদিন পারবে আমি জানি না।কিন্তু আমার চাওয়ার জন্য লোকে তোমায় ভুল বুঝছে,মিঠি ভুল বুঝছে এটা যে আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।নিজেকে ভীষণ অপরাধী লাগছে আমার।"অভীকের মুখে হালকা চাঁদের আলো পরেছে। পৃথা তাকিয়ে থাকে।এই মানুষটা কি করে এত ভিতরের কথাগুলো বুঝে ফেলল।মনে মনে ভাবে পৃথা এই পৃথিবীতে সবাই তো সব পায় না।নিজের ইচ্ছে মত মা হওয়া হয়ত তার হয় নি।কিন্তু যেটা সে ভাবেও নি সেই রকম স্বামী সে পেয়েছে।সেটা সে নিজে বোঝেও নি।চোখের জল মুছে ঠোঁটের কোনে হাসি ফোটায় পৃথা।বলে-"মিঠির মা আমি হবই অভীক।তবে নিজের কল্পনা মত নয়।যেমন মিঠি চায় তেমন।মা দের তো সন্তানের ইচ্ছের কাছে হারতেই হয়।এটা যে মা হবার প্রথম শর্ত সেটা ভুলে গিয়েছিলাম।"
বিয়েটা রেজিস্ট্রি করেই করেছিল ওরা।মেয়ের কথা ভেবে পৃথাই প্রস্তাবটা দিয়েছিল।আসলে মেয়ে বড় হচ্ছে।সে কিভাবে নেবে বাবার বিয়ে সেটা নিয়ে একটু টেনশানে ছিল পৃথা।কিন্তু দেখা গেল মেয়েটা অখুশী হয়নি।আসলে ও তো জন্মে ওর মাকে দেখেনি তাই বোধহয় পৃথাকে বাবার বৌ ভাবতে তার অসুবিধা হল না।সে উলটে একটা লেহেঙ্গা কিনল বিয়েতে।পৃথার অবশ্য এইটুকু বাচ্চা মেয়ের লেহেঙ্গা পরা মোটেই ভালো লাগে না।ওসব পরার জন্য ঢের বয়েস পরে আছে।পৃথা বিয়ের পরই রিসেপশানের আগে বেবিল্যান্ডে গিয়ে মিঠির জন্য অনেকগুলো বেবি ফ্রক কিনল।পরলে মিঠিকে পরী লাগবে।মিঠির সঙ্গে এখনও তেমন ভাব জমানো হয় নি পৃথার।বিয়ের পর বাড়িতে আসার পর শুধু মিঠি বলেছিল -"তোমাকে নতুন বৌএর মত দেখতেই না।পচা।"আসলে ও ভেবেছিল বেনারসি চন্দন পরা বৌ নিয়ে আসবে বাবা।কিন্তু মেয়ের চোখে লাগবে ভেবেই পৃথা নর্মালি একটা দামী চান্দেরি পরেছিল। খোঁপায় জুঁইএর মালা আর কপালে লাল টিপ পরেছিল।মিঠির এক্সপেকটেশন মেলে নি।সবাই হেসেই ফেলেছিল মিঠির কথায়।পৃথাও হেসেছিল।পাকা বুড়ি একটা।
ভাব জমাতে মিঠির ঘরে জামাগুলো নিয়ে গেল পৃথা।মিঠি ওকে দেখে বলল-"বৌ মা এসেছ।ওকে এসো।"বৌ মা!এ আবার কেমন ডাক।পৃথা জানে মিঠি তার মাকে দেখে নি।সুতরাং পৃথাকে মা বলতে কোন অসুবিধা হবার কথা তো নয়।তবে এমন অদ্ভুত ডাক ডাকছে কেন ও?ওর ঠাকুমাকে নকল করছে?মা নিয়ে যদি অবচেতন কোন সমস্যা থাকে তবে না হয় মামনি ডাকুক।পৃথা বলে-"বৌ মা আবার কি।তুমি মা বলবে আমায়।ঠিক আছে।"মিঠি ঘাড় নাড়ে।পৃথা ওর হাতে জামাগুলো দেয়। ফোকলা হাসি হেসে মিঠি জামাগুলো বার করে।কিন্তু জামা গুলো দেখে নাক সিঁটকে সরিয়ে দেয়।বলে-"আমি কি বেবি।এসব জামা পড়ব না।আমি তো লেহেঙ্গা পরব কারিনার মত।"বিশ্রী লাগে পৃথার কানে।এই টুকু মেয়ে এসব শেখে কোত্থেকে?আসলে কাজের লোকেদের কাছে মানুষ তো,তাই এসব কারিনা টারিনা শিখেছে।পৃথাকে এই মাটির তাল কে প্রপার শেপে আনতে খাটতে হবে।পৃথা বলে-"না মিঠি ওগুলো পচা।এগুলো পড়লে তোমায় ডলের মত লাগবে।"মিঠি মাটিতে নেমে পা ঠুকে বলে-"না,আমি লেহেঙ্গা পরবই।"পৃথার মনে হল বড্ড জেদী মেয়ে।আসলে মা মরা মেয়ে তো তাই জেদ এতো।বেশী আদরে মানুষ হলে যা হয়।পৃথা কথা বাড়ালো না।
পরেরদিন রিসেপশানে মিঠি লেহেঙ্গাই পরল।পৃথা অভীককে আগে থেকে বলে রেখেছিল যে ফুলসজ্জা এসব যেন না করা হয়।পৃথা চায় মেয়ে বাবা মা দুজনের মাঝখানে শোবে।বাচ্চার আলাদা ঘরে শোবার পক্ষপাতী সে নয়।এতে বাবা মায়ের সাথে মেন্টাল এটাচমেন্ট তৈরি হয় না। কিন্তু মিঠিকে কিছুতেই রাজী করানো গেল না।সে তার টেডি টুডু বার্বি নিয়ে তার নার্সারি রুমে শুতে চায়।সেখানে হালকা গান চলে আর সে ঘুমিয়ে যায়।পৃথা বলে-"মিঠি আমি তোমায় আরো ভালো গান শোনাবো।"পৃথার গানের গলা মিষ্টি।কিন্তু একটু ঘুম পাড়ানি গান শুনে উঠে বসে মিঠি।বলে-"কি বিচ্ছিরি পচা সুর।এটা আমি শুনি না।"প্রায় বায়না করেই নিজের ঘরে শুতে যায় মিঠি।পৃথার কল্পনায় একের পর এক আঘাত লাগে।মনে মনে ভাবার চেষ্টা করে সময় লাগবে।বুনো অবাধ্য ঘোড়া।পোষ মানাতে সময় লাগবে।
পৃথা সকালে উঠে কর্ণফ্লেক্স রেডি করে নিজের হাতে।কাজের রান্নার মেয়েদের বলে দেয় আজ থেকে তারা বাড়ির অন্য কাজ করবে।মিঠির সব কাজ করবে পৃথা নিজে।কিন্তু খাবার টেবিলে আবার অপ্রিয় ঘটনা ঘটে।অন্যদের পরোটা দেখে মিঠি বায়না শুরু করে সেও পরোটা খাবে।পৃথা এবার ওর জেদকে গুরুত্ব দেয় না।প্রায় জোর করেই কর্নফ্লেক্স খাওয়ায়।মিঠি বলে-"বাজে মা, পচা মা।"পৃথা রাগ করে না।এই ভাবে ধীরে ধীরে সব পাল্টাতে হবে।
এতদিন মিঠি হারুদার কাঁধে চেপে ঘুরত।হারুদা বাগানের মালি।পৃথা অভীক কে বলল-"তুমি না একটুও মেয়েটাকে দেখ না।বড় হচ্ছে।মালির কাঁধে উঠবে।এটা ভালো দেখায়।তাছাড়া চারদিকে দেখছনা।কত খারাপ খারাপ ঘটনা ঘটছে।এসব মেলামেশা বেশী ভালো না।"অভীক বলে-"পৃথা হারুদা ওর জন্মের বিশ বছর আগে থেকে এবাড়িতে আছে।"পৃথা বলে-"আমি তো অস্বীকার করছি না।কিন্তু একটা সময় কন্যা সন্তানের বাবামাদের একটু খারাপ চিন্তাও করতে হয় অভীক।"
অভীক বোঝে পৃথা মিঠির ভালো চায়।পৃথাকে কিছু বলা মানে ওর আবেগকে আহত করা।কিন্তু মেয়েটা তো হারু দাকে বড্ড ভালোবাসে।পৃথা মিঠিকে পার্কে খেলতে নিয়ে যেতে চায়।মিঠি বলে সে হারুদার পিঠে ঘোড়া চরবে।কিছুতেই মিঠিকে বাগে আনতে পারে না পৃথা।মিঠিকে হারুদার সাথে খেলতে দেয় না বলে মিঠি ওর ঘরে গিয়ে দরজা দিয়ে বসে থাকে।পৃথা পুচকে মেয়ের দু:সাহস দেখে অবাক হয়ে যায়।মাঝখান থেকে হারু অপ্রস্তুত হয়।সে পৃথাকে বলতে আসে-"দিদিমণি আমি কি খুকীকে বুঝিয়ে দেখব।"অপমানে মুখ লাল হয়ে যায় পৃথার।সে মা যা পারছে না।হারু মালি সেটা পারবে।কিছু না বলে পৃথাও ঘরে চলে যায়।রাতে মিঠিকে অভীক বুঝিয়ে সুজিয়ে খাবার টেবিলে নিয়ে আসে।পৃথাও ভাবার চেষ্টা করে প্রথমেই হাল ছাড়লে চলবে না।মিঠি বেশী কিছু খেতে পারে না।বমি হয় ওর।পৃথা চিন্তায় পরে যায়।মিঠি বলে-"পচা মা সকালে আমায় কর্ণফ্লেক্স দিয়েছে তাই আমার বমি হচ্ছে।"অভীক বলে -"ছিঃ মিঠি ওকথা বলে না।"ডাক্তার আসে।বলে এসিড হয়ে গেছে।জিজ্ঞাসা করেন-"কি খেয়েছিল?"পৃথা চুপ করে থাকে।নিজেকে অপরাধী লাগে তার।ডাক্তার চলে গেলে রান্নার মাসি এসে কেঁদে ফেলে।বলে-"বৌরানী আমায় ক্ষমা কর।আজ সকালে বেবি যখন পরোটা খাবে বলে কাঁদল আমি ওকে একটা পরোটা দিয়ে ছিলুম।হয়ত সেই জন্যই।..."
পৃথা কিছু বলতে পারে না।কি ভাবে এরা? সে মিঠিকে খেতে দিতে চায় না?সে মিঠিকে কষ্ট দিতে চায়?প্রথম থেকেই সৎ মায়ের তকমাটা তার গায়ে এরা লাগিয়েই দিল।
নিজের শোবার ঘরের বারন্দায় এসে দাঁড়ায় পৃথা।অন্ধকার বারন্দায় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলে পৃথা।কিছুক্ষণ পর কাঁধে হাত রাখে অভীক।পৃথা নিজেকে সামলাবার চেষ্টা করে।অস্ফুটে অভীক বলে-"আই এম সরি।"অবাক হয়ে তাকায় পৃথা।অভীক বলে -"আমি জানি পৃথা তুমি কষ্ট পাচ্ছ।আর সেটা পাচ্ছ আমার ইচ্ছের মূল্য রাখতে।আমি চেয়েছিলাম তুমি আমার স্ত্রীর চেয়ে বেশী মিঠির মা হয়ে এসো।তুমিও সেটাই চেয়েছিলে।সেটাই চেষ্টা করেছিলে।তার জন্য শুরু থেকে শুধু সেক্রিফাইস করে চলেছ তুমি।তুমি মিঠির মা হয়ে মিঠির ভালো চেয়েছ।কিন্তু সেটা নিজের মত করে চেয়েছ।যেটা মিঠি মেনে নিতে পারছে না।হয়ত একদিন পারবে আমি জানি না।কিন্তু আমার চাওয়ার জন্য লোকে তোমায় ভুল বুঝছে,মিঠি ভুল বুঝছে এটা যে আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।নিজেকে ভীষণ অপরাধী লাগছে আমার।"অভীকের মুখে হালকা চাঁদের আলো পরেছে। পৃথা তাকিয়ে থাকে।এই মানুষটা কি করে এত ভিতরের কথাগুলো বুঝে ফেলল।মনে মনে ভাবে পৃথা এই পৃথিবীতে সবাই তো সব পায় না।নিজের ইচ্ছে মত মা হওয়া হয়ত তার হয় নি।কিন্তু যেটা সে ভাবেও নি সেই রকম স্বামী সে পেয়েছে।সেটা সে নিজে বোঝেও নি।চোখের জল মুছে ঠোঁটের কোনে হাসি ফোটায় পৃথা।বলে-"মিঠির মা আমি হবই অভীক।তবে নিজের কল্পনা মত নয়।যেমন মিঠি চায় তেমন।মা দের তো সন্তানের ইচ্ছের কাছে হারতেই হয়।এটা যে মা হবার প্রথম শর্ত সেটা ভুলে গিয়েছিলাম।"
********************

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন