সতী মাস্টার

অরিন্দম নন্দি 

নির্জন স্টেশন চত্বর টি কাঁপিয়ে বাজ পড়ল কাছের একটি ফাঁকা মাঠে! সতীনাথ স্টেশন মাস্টারের কপালে বিরক্তির ভাঁজ দেখা দিল, সাথে উদ্বেগ ও! গুমটি স্টেশনঘরের জানলা দিয়ে যতদূর সম্ভব আকাশ টা দেখার চেষ্টা করল সে! একটাদিক পুরো দখল করে রেখেছে কৃষ্ণ বর্ণ মেঘ বাহিনী! গাছপালা থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে! লক্ষণ ভাল নয়। কালবোশেখি র লক্ষণ প্রকট! বিরক্ত মুখে স্টেশন কাম টিকিট ঘরের হলুদ রঙের সাইনবোর্ড টা ঠিক করতে লাগল!
রঘুনাথগঞ্জ হল্ট স্টেশন! চক্রধরপুর আদ্রা লাইনে এই একফালি জমিটি না থাকলে বোঝাই যেতনা স্টেশন বলে কিছু আছে! প্লাটফর্ম বলতে মোরাম বিছানো উঁচু খানিকটা অংশ! স্টেশন আর টিকিট ঘর দুই যমজের মত পাশাপাশি গলা জড়িয়ে আছে আজ গত পঞ্চাশ বছর ধরে! সারাদিনে ট্রেন বলতে সকাল ৭:৪৫ আর রাত ৮:২০ র চক্রধরপুর আদ্রা প্যাসেঞ্জার! সারামাসে সর্বসাকুল্যে দশ জন যাত্রী আসা যাওয়া করে কিনা সন্দেহ! লাভের লাভ বলতে সারাদিন সতীমাস্টারের নির্বান্ধব জীবন কাটান আর আপ ট্রেনের গার্ডের কাছ থেকে প্রতিদিনের বেঁচে থাকার রসদ সংগ্রহ করা! মাঝেমধ্যে সংবাদপত্র হাতে পায়! তাতেই যতটুকু জানতে পারে নিজের কোলকেতা সম্পর্কে! বাকি সময় টা নির্জন অন্ধকারে দিন কাটানো! ওহ হ্যা! বলা হয়নি! একেবারে নির্বান্ধব হয়ত নয়! মাঝেমাঝে পাশের দশ কিমি দূরে পাঁচখালি গ্রাম থেকে রেলেরই এক পোর্টার এসে জরুরি খবর দিয়ে যায় লাইনের হালহকিকত নিয়ে! তার কাছ থেকেই আজ সকালে জানতে পারে রঘুনাথগঞ্জ স্টেশন থেকে অনতিদূরে মালগাড়ী লাইনচ্যুত হয়ে পুরো বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে! আজ আর কোন ট্রেন নেই! পচে মর শালা আজ এই নরকে! বিরক্তমুখে টিকিট ঘরের জানলা টা বন্ধ করতে গিয়ে চোখ গেল দুরের বকুল গাছটার নীচে! একটা দেহাতি লম্বা চেহারার বুড়ো বসে বসে ঢুলছে! প্রথম টায় সে ভাবল মনের ভুল! কিন্তু ভুলটা ভাংল পরের বিদ্যুতের আলোয়!সত্যি ওখানে কেউ বসে! আর বুড়ো টা একদৃষ্টে তার দিকেই চেয়ে আছে! সতীনাথ স্টেশনমাস্টার এর রক্ত হিম হয়ে গেল! এই নির্জন জনপদে এ কেরে বাবা এই অবেলায়! তাড়াতাড়ি জানলা বন্ধ করে দিয়ে পিছনে ঘুরেই দেখে স্টেশন ঘরের বাইরের প্লাটফর্মের বেঞ্চিতে ওই বুড়ো টা বসে আছে আগের ভংগিতেই!! স্টেশন থেকে বকুল গাছটা কিছু না হলেও একশ ফুট দূরে। এরই মধ্যে এত তাড়াতাড়ি......?????
কিছু বুঝতে না পেরে তালকানার মত দাঁড়িয়ে থাকে মাস্টার! পরে হতভম্ব ভাবটা কেটে যেতে নিজেকে প্রবোধ দেয়, একেবারে নির্বান্ধব কাটানোর চেয়ে বিধাতা হয়ত একজনকে পাঠিয়েছে সময় কাটানোর জন্য! আবার এও হতে পারে লোকটির হয়ত খুব বিপদ! সাহায্যের জন্য এসেছে! ভদ্রতার খাতিরে সুর মোলায়েম করে কাছে গিয়ে সতী মাস্টার ডাক ছাড়ে- দাদা! শুনছেন? আপনার কি কিছু হয়েছে! এখানে এলেন কি ভাবে এই দুর্যোগে! বুড়োটা বিশেষ নড়চড় করলনা! শুধু লম্বা চুলের মধ্যে দিয়ে জুলজুল করে তাকিয়ে রইল স্টেশনমাস্টার এর দিকে!
সতীর এবার ধৈর্যর বাঁধ ভাংল! বলল দেখুন ইয়ার্কি ভাল লাগেনা! সোজা ভাবে বলুন কি চান! সাধ্যের মধ্যে হলে চেষ্টা করে দেখব! বুড়ো আচমকা সতীর দুই হাত চেপে ধরে অদ্ভুত খ্যানখেনে গলায় বলে ওঠে তুমিই পারবে বাবা আমাকে উদ্ধার করতে! তুমি খুব ভাল মানুষ জানি!! সতী কঁক করে ওঠে হাত ধরার চাপে! ওরকম ঠান্ডা কোন জীবিত মানুষের হাত হয়??!!! বুড়োটা বোধহয় বুঝতে পেরে লজ্জিত ভাবে হাত ছেড়ে দিয়ে আবার আগের মত ঢুলতে লাগল!
এবার স্টেশনের আরো কাছে একটা বাজ পড়ল! এত বাজ পড়ছে কেন আজ! সতী মাস্টার বলে চলুন ভিতরে গিয়ে বসি! আকাশের অবস্থা ভাল নয়! এখানে বসে দুজনকেই ভিজতে হবে!
অতঃপর দুজনে গুমটিঘরএর ভিতর দরজা খুলে ঢুকল! মোম জ্বালিয়ে সতী বুড়ো টিকে ভাল করে নিরীক্ষণ করতে লাগল! চেহারার সর্বত্র বার্ধক্য র ছাপ স্পষ্ট! রোগা লম্বা হাতের আঙুল গুলো শিরাওঠা রুগ্ন! সাদা পাঞ্জাবি আর ধুতিতে বুড়োটিকে বিধ্বস্ত লাগছিল! আচমকা সম্বিৎ ফেরে প্রশ্নে- বয়স কত হল ছোকরা? একটু রাগ হল এই জাতীয় সম্বোধনে কিন্তু তাও সামলে নিয়ে হাসি মুখে বলে আজ্ঞে পঁয়ত্রিশ!
- এখানে পড়ে আছ কতদিন?
- হয়ে গেল সাত বছর
- ট্রান্সফারের চেষ্টা করনি?
- আর বলেন কেন! উপরমহল কে চিঠি লিখে হয়রান হয়ে গেছি! দেখছি দেখব করে আজ সাতবছর কাটিয়ে দিল! রিপ্লাই আসার নাম নেই!
- এসে যাবে!
- কি?
- ওই যে রিপ্লাই না কি বললে! আমি বাবা তোমাকে তুমি করেই বলছি! তুমি আমার ছেলের বয়সী!
- না না সে ত ঠিকই! আচ্ছা চা খাবেন? বলতে বলতে সতী নিজের একফালি রান্নাঘরের দিকে চলে গেছে! রান্নাঘর বলতে গুমটি ঘরের কোনে ইঁট দিয়ে একটু উঁচু মতন জায়গা! সেখানেই তার রান্নার যাবতীয় সরঞ্জাম! কেটলি তে চা বসাতে বসাতে বুড়োকে শুধাল তা আপনি এখানে এই দুর্যোগের মধ্যে এলেন কি করে! বুড়ো টা বোধকরি সে কথা না শুনে অজান্তেই নিজের বৃত্তান্ত শুরু করে দিল-
- এই স্টেশন থেকে দশ কিমি এগিয়ে যে পাঁচখালি গ্রাম আমি সেখান থেকে আসছিলাম! যাচ্ছিলাম কেকড়াডিহি তে আত্মীয়ের বাড়ি!সাথে একটা মূল্যবান জিনিষ ছিল! আসার পথে কোথায় হারিয়ে গেছে কে জানে? তার উপর এই দুর্যোগ! পথ হারিয়ে এই স্টেশনের কাছে এসে পড়ি!
- কেকড়াডিহি তো অনেক দূর! আপনি এভাবে যাবেন কি করে! আর আপনার কি একটা জিনিষ হারিয়ে গেছে বললেন না? কি সেটা!
- বুড়ো টা রহস্যময় হাসি হেসে বলল তুমি খুব ভাল মানুষ! তোমাকে বলা যেতেই পারে! শুধু তুমি কথা দাও জিনিষ টার সদ্ব্যবহার করবে???
- সতী আগাগোড়া কিছু বুঝতে না পেরে বোকার মত হাসল! আবার স্টেশন চত্বর কাঁপিয়ে বাজ পড়ল কোথাও! সংগে জোলো হাওয়ার সাথে দু এক ফোঁটা জল ভেসে এল ঘরের ভিতর! মাটিভেজা গন্ধের সাথে মোমের নিভন্ত আলো গোটা পরিবেশটাকেই রহস্যময় করে তুলেছে!
- বুড়ো শুরু করল তার কাহিনী
- ঘরে আমার বাড়ন্ত মেয়ে! মেয়ে বললে ভুল হবে! রূপে লক্ষী গুণে সরস্বতী! বাবা হয়ে একথা যদিও বলতে নেই তাও না বলে থাকতে পারলাম না! আর গ্রামের বখাটে গুলোর নজর আমার মেয়ের দিকেই!! বিয়ে দিয়ে দেব!আর পড়াবার মত সামর্থ্য নেই কো!! আমার একফালি জমি ছিল গ্রামে পড়ে! একটু আধটু চাষ আবাদ করতাম! জমিটা বন্ধক রেখে কিছু গয়না কিনেছিলাম মেয়ের জন্য! গয়নাগুলো পুঁটলি করে নিয়ে আসার সময়.............
- বুড়োর কথা গুলো খুব মন দিয়ে শুনছিল সতী মাস্টার! কিন্তু শেষের কথা টা সমাপ্ত হতে না হতেই স্টেশনের লাগোয়া পোড়ো জমিতে প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ল! সতীর কানে তালা ধরে গেল! সতী সম্বিৎ ফিরে পেতে দেখল বুড়ো জানলা দিয়ে দূরে তাকিয়ে কি যেন দেখছে! আচমকা সতীর দিকে ফিরে বলে বসল - বাবা! তুমি আমার মেয়েটাকে একটু দেখো! ওকে বিয়ে করে নাও! এই বুড়ো বাপটা মরেও শান্তি পাবে না! আমি ছাড়া মেয়েটার কেউ নেই গো!
- এই কথাটায় এসে বুড়ো কেমন যেন থম মেরে গেল! আর সতী যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না এহেন নির্বান্ধব জীবনে এমন অপ্রত্যাশিত প্রস্তাব মেয়ের বাবার কাছ থেকে এরকম দুর্যোগ মুখর দিনে কেউ পেয়েছে কি না তার জানা ছিল না! কেমন যেন লজ্জা পেয়ে গেল রঘুনাথগঞ্জের স্টেশনমাস্টার!
- যাহ্‌ কি যে বলেন না!
- আচমকা বুড়ো একলহমায় জানলা থেকে সরে এসে সতীর হাত ধরে বলে ওঠে বাবা তুমি ই পারো মেয়েটাকে বাঁচাতে! বিয়ে করে নাও সুখী হবে তোমরা! আমার সময় বড় কম! বল! কথা দাও!
- কিরকম যেন ঘোরে আচ্ছন্ন সতে মাস্টার বলে উঠল আপনার মেয়েকে নিয়ে ভাবতে হবে না! আমি ওর রক্ষণাবেক্ষণ এর দায়িত্ব নিলাম! আচমকা ঝোড়ো হাওয়ায় জানলা খুলে গিয়ে একরাশ জলকণা ঢুকে ঘরটাকে ভিজিয়ে দিল!
- এস আমার সাথে এস। সময় বড় কম! বলে হাত ধরে টান লাগায় বুড়ো! বাইরে তখন বৃষ্টি সবে হালকা হয়েছে! আকাশ পরিষ্কার হয়ে সবে দু একটি তারা উঁকি মারছে আকাশে! মাটিভেজা গন্ধের সাথে অজানা ফুলের গন্ধে মাতোয়ারা চারদিক! লাইনের খোয়ার উপর দিয়ে হোচট খেতে খেতে মাস্টার এগিয়ে যায় এক দুর্নিবার টানে!
- কতক্ষণ ধরে তারা হেঁটেছিল মনে নেই, একসময় একজায়গায় এসে বুড়োর হাঁটা শেষ হয়! সতী দূরে তাকিয়ে দেখে লাইনে শেষ প্রান্ত যেখানে বাঁক নিয়েছে সেখানে এক লাল সিগনাল বাতি রহস্যময় ভাবে রক্ত চক্ষু নিয়ে তার দিকে চেয়ে আছে!
- এ আমায় কোথায় নিয়ে এলেন? বুড়ো কিছু না বলে দূরে অংগুলি নির্দেশ করে......
- সেদিকে তাকিয়ে বুকের রক্ত হিম হয়ে যায় স্টেশনমাস্টার এর!! একটি মালগাড়ি লাইনচ্যুত হয়ে অবিন্যস্ত ভাবে এদিক ওদিক ছড়িয়ে আছে......আরও ভয়াবহ ব্যাপার একটা ওলটানো বগির তলায় রক্ত মাখা একটি শরীর!!! ধুতি পরা পা দুটো বেরিয়ে আছে! মাথায় সেই অবিন্যস্ত সাদা লম্বা চুল! অজ্ঞান হতে হতে সতী টের পেল পাশের জন কায়া রূপ ছেড়ে ছায়াতে রেণু রেণু হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে! দূর থেকে কার কন্ঠস্বর ভেসে আসছে!.......... আমার মেয়েকে দেখো বাবা
- ও বড় একা! ব্যস! তারপর আর কিছু মনে নেই সতীর!! জ্ঞান ফেরে পরদিন সকালে পোর্টারের ডাকে! উঠতে গিয়ে টের পায় সারা মুখ ভিজে গিয়েছে পোর্টারের ছিটানো জলে! লাইনের উপর গত রাতের বীভৎসতার লেশমাত্র চিহ্ন নেই! তার পাশে পড়ে আছে একটা পুঁটুলি! কোনমতে উঠে দাঁড়িয়ে সে বলে আচ্ছা এখানে যার বডি টা ছিল.........পোর্টার টা কথা শেষ করতে দেয়না তাকে! বলে ওঠে ও আমাদের নিধু কত্তা গো বাবু! খুব ভাল মন ছিল ওনার! নিঃস্ব হয়েও দুবেলা কাঙালি ভোজন করাতেন গো! ওর মেয়েটা বড় একা হয়ে গেল! কেউ থাকল না গো!
- আমাকে নিয়ে যেতে পারবে তার বাড়ি???
- অতঃপর আধক্রোশ ঠেঙিয়ে যখন তারা পৌছাল তখন বাড়ির সামনে ছোটখাট ভিড় জমে গিয়েছে! একতলা ছাউনি দেওয়া বাড়িটার ভিতর থেকে ভেসে আসছে রমনীর বিলাপ! দোনামনা করে ভিতরে ঢুকতেই তাকে দেখে কান্নার রোল থেমে গেল! সতী দেখল আলুথালু বেশ ও অবিন্যস্ত চুলের ভিতর থেকে একজোড়া ডাগর জলভেজা চোখ তারদিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে! সতী পরম মমতায় মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে বাবা পাঠিয়েছেন আমাকে তোমার কাছে! সবার হতভম্ব চোখ জোড়ার মাঝে অস্বস্তি হতে থাকে সতীর! মেয়েটি শুধু অস্ফুটে বলে ওঠে বাবা!!! সতী কিছু না বলে তার কাপড় ঠিক করে দেয়! তারপর কয়েকজোড়া বিস্ফারিত চোখের সামনে দিয়ে মেয়েকে নিয়ে আস্তে আস্তে বেরিয়ে যায়! যাওয়ার সময় সে শুধু একটা কথা জিজ্ঞাসা করেছিল- তুমি কি আমায় বিয়ে করবে? উত্তরে সলজ্জ জলভরা চোখ দুটি নামিয়ে নিয়েছিল সে! সতী হাতটি চেপে ধরে তার হাতে ধরিয়ে দেয় নিধু কত্তার শেষ জীবনের সম্বল গয়নার পুঁটুলি টি! বলে যত্নে রেখ! তোমার বাবার আশীর্বাদ! দুটি হাত ধরা শরীর আস্তে আস্তে লাইনের বাঁকে মিলিয়ে যেতে থাকে! একটা ছায়ামূর্তি দমকা হাওয়ার চাপে ওদের চলে যাওয়া পথের দিকে চেয়েই মিলিয়ে যায়!
বলা বাহুল্য পরের দিনই সতীর কাছে এসে পৌছায় প্রোমোশন ও ট্রানফার লেটার..........বকুল গাছটার সুগন্ধে গোটা স্টেশন চত্বর মম করছে!!!!!!

২টি মন্তব্য:

ডাকটিকিট বা স্টাম্প

ডাকটিকিট বা  স্টাম্প                                                        পৃথিবীতে প্রথম কি ভাবে প্রচলন হলো আর কেমন ছিলো  *********...