
হেডস্যর
শনিবারের বৃষ্টি ভেজা দুপুর! প্রথম থেকেই আকাশের হাল হদিশ আমার ভাল ঠেকছিল না! সাত সমুদ্র তের নদী ঠেঙিয়ে স্কুল যাওয়া! ধুর!! জমিয়ে একটা ঘুম দেব ভাবছিলাম.....আচমকা একটা কথা মাথায় আসতেই ধড়মড় করে উঠে বসলাম! আজ কি বার যেন? শনিবার না? সর্বনাশ! আজ তো মিড ডে মিলে ডিম আর খিচুড়ি! আর তার হিসেবের ভার স্যর আমাকেই দিয়েছেন! না গেলে স্যরের দাঁত খিঁচুনি তো খেতে হবেই তার সাথে উপরি পাওনা কলিগ দের টিপ্পনী! অগত্যা মুখ বাংলার পাঁচ! আধ ভেজা হয়ে যখন স্টেশন পৌছালাম ট্রেন ছাড়তে আর মিনিট পাঁচেক বাকি! আমাদের সহযাত্রী গুলো তখনো আসেনি! কিন্তু চাপ নেই! জানতাম ট্রেন ছাড়ার ঠিক মুহুর্তেই সবকটা হুপ হুপ করতে করতে উঠে পড়বে! কিষ্কিন্ধ্যা র অরণ্যের মধ্যে নিজেও কখন মাতলামিতে হনুমান হয়ে যাই সে মান আর হুঁশ বোধ হয় বিধাতাও আমাকে দেয়নি! স্কুল যখন পৌছলাম পুরো স্নান করে গেছি! কিন্তু স্কুল গেটের কাছে পা রাখতেই পুরো থ! গোটা স্কুল খাঁ খাঁ করছে বৃষ্টির মধ্যে! কোন ছেলেপিলে চোখে পড়ল না! রাগে দুঃখে স্যরের ঘরের দিকে পা বাড়াতেই চোখে পড়ল স্যর এক হাতে সিগারেট আরেক হাতে চায়ের কাপে সুখটান দিচ্ছেন! আমাকে দেখে একগাল হেসে বললেন
- এলে তাহলে? মনে মনে বললাম না এসে উপায় আছে? কিন্তু মুখে বলি স্যর আজ স্কুল ফাঁকা তো? মিড ডে মিল কি হবে? আজকের হিসেব? একরাশ সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে স্যর আমার দিকে তাকালেন! বললেন- মিড ডে মিল যাদের জন্য তারাই যদি না আসে তাহলে রান্না কি ভূতে খাবে? আর রান্নার মহিলা গুলোও তো আসেনি আজ! তুমি আমি আর আরেকজন এসেছেন! তাঁকে দেখছিনা এখন! দেখো স্টাফ রুমের কোথাও হয়ত ঘুমাচ্ছেন! ধপ করে বসে পড়লাম আমি! পুরো স্কুলে মোটে তিন জন! আর এই জন্য এত দূর থেকে কাকভেজা হয়ে ছুটে আসা!!! হতাশা আর রাগ কোনটা আগে বেরোবে বুঝতে না পেরে পুরো ক্যাবলাকার্তিক বানিয়ে রেখে দিল আমাকে খানিক খন! অনেক পরে আস্তে আস্তে বললাম তাহলে স্যর বাড়ি যাই! স্যরের এতক্ষণ পরে আমার অবস্থা দেখে মায়া হল! বললেন কিছু খেয়েছ? আমি গাঁইগুঁই করতে লাগলাম! কি খাব স্যর? এত সকালে খাওয়া যায়? যেতে আসতে পুরো তিন ঘন্টা!
স্যরের গলাটা হঠাৎ কিরকম যেন গম্ভীর হয়ে গেল! বলে উঠলেন- পেটের জ্বালা বড় দায় অরিন্দম! মনের সুকুমার বৃত্তি গুলোকেও শেষ করে দেয় এই জ্বালা! আমি একটু অবাক হয়ে মানুষ টাকে ভাল করে দেখতে চেষ্টা করলাম! স্যরের গম্ভীর মুখটা থেকে একটা একটা করে খোলস খসে পড়ছে মনে হল! জিজ্ঞেস করলাম স্যর কি হয়েছে আপনার! কোন ভাবান্তর দেখা গেল না স্যরের মধ্যে! স্যর তখন কি এক ঘোরের মধ্যে বলে চলেছেন - জানো অরিন্দম আমি লোকটা না খুব খারাপ! সারাজীবন না একটা ভাল স্বামী র দায়িত্ব পালন করলাম না একটা আদর্শ পিতার! যুবক বয়সে মেসে থাকতাম কয়েক জন মিলে! সেখানে থেকেই পরীক্ষার পড়াশোনা করতাম! সকালে টিউশনি আর রাতে কলেজ থেকে ফিরে বুক বাইন্ডিং এর কাজ করতাম! মাঝে পড়াশোনা টা ঠিক রেখেছিলাম! একসময় হেডমাস্টার নিযুক্ত হয়ে যখন এলাম এই স্কুলে দেখলাম অনেকের অনেক সমস্যা! সবার সমস্যা মেটানো তোমার পক্ষে সম্ভব নয়! আবার সবাইকে খুশি করাও যাবেনা! সারাদিন এই স্কুল বাড়িটা আগলে পড়ে থাকতাম! এ আমার কাছে সন্তানের মতন! বাড়িতে সময় দিতে পারতাম না! কত রাত বাড়ি যাই নি! স্কুলে রাত জেগে কাজ করেছি! কি পেলাম জীবনে? বউটাও বুঝলনা! ছেলেকে নিয়ে আলাদা থাকতে শুরু করল! প্রথম প্রথম যোগাযোগ ও করতে দিতনা! একদিন ছেলে সামনে দাঁড়িয়ে শুনিয়ে দিল আমি নাকি তার বাপই না! অরিন্দম তোমরা যখন আমাকে অভিযোগ কর তখন আমার বুক ফেটে কান্না আসে জান? কিন্তু ওই চেয়ারে বসে কাঁদতে নেই! পেশাদারিত্ব আমার জীবনে পুরো অভিশাপ হয়ে গিয়েছে! যত সৎ থাকতে চেয়েছি তত লোকের চোখে বিদ্ধ হয়েছি! হেডমাশটার হেব্বি হারামি এই কথা শুনতে শুনতে কান আমার পচে গেছে! এখন আর ওসব কিছু মনে হয় না! পরের বছর আমি রিটায়ার করে যাব! কিন্তু বিশ্বাস কর এই জায়গাতে আমি আমৃত্যু থাকতে চাই! এই জায়গা আমার বড় নিজের!
আমি সম্মোহিতের মত কথা গুলো শুনছিলাম! রাগী মানুষটার আজ সম্পূর্ণ অন্যরূপ দেখলাম আমি! পেশার কাঠামোতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা মানবজীবন বড় অসহায়! দেখলাম স্যরের চোখের কোণে জল চিক চিক করছে! মুহুর্তের জন্য নিজের পেশাগত অবস্থান ভুলে গেলাম! আস্তে করে স্যরের চেয়ারের সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে বললাম স্যর আপনি কিছু খেয়েছেন সকাল থেকে? চলুন দুজনে মিলে খিচুড়ি বসাই! ডিম তো আছে! দুই বেলা হয়ে যাবে দু জনার! কি বলেন স্যর? হেড মাষ্টার অবাক চোখে তাকালেন আমার দিকে! আমি বলে উঠলাম না স্যর আজ ভাবছি বাড়ি ফিরব না! রাতে থেকে যাব আপনার কাছে! এত কাজ আপনি একা সামলান আর আমি পারবনা! তখন আঁধার ঘনিয়ে এসেছে! স্কুল পাগল মানুষটার মুখ ভাল করে দেখতে পারলাম না! শুধু অনুভব করলাম আমার বাম কাঁধে সম্মতির একটি উষ্ণ স্পর্শ! পুকুরের দিকে কনকচাঁপা গাছটির সৌরভে গোটা স্কুল বাড়ি মম করছে তখন....!!!
- এলে তাহলে? মনে মনে বললাম না এসে উপায় আছে? কিন্তু মুখে বলি স্যর আজ স্কুল ফাঁকা তো? মিড ডে মিল কি হবে? আজকের হিসেব? একরাশ সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে স্যর আমার দিকে তাকালেন! বললেন- মিড ডে মিল যাদের জন্য তারাই যদি না আসে তাহলে রান্না কি ভূতে খাবে? আর রান্নার মহিলা গুলোও তো আসেনি আজ! তুমি আমি আর আরেকজন এসেছেন! তাঁকে দেখছিনা এখন! দেখো স্টাফ রুমের কোথাও হয়ত ঘুমাচ্ছেন! ধপ করে বসে পড়লাম আমি! পুরো স্কুলে মোটে তিন জন! আর এই জন্য এত দূর থেকে কাকভেজা হয়ে ছুটে আসা!!! হতাশা আর রাগ কোনটা আগে বেরোবে বুঝতে না পেরে পুরো ক্যাবলাকার্তিক বানিয়ে রেখে দিল আমাকে খানিক খন! অনেক পরে আস্তে আস্তে বললাম তাহলে স্যর বাড়ি যাই! স্যরের এতক্ষণ পরে আমার অবস্থা দেখে মায়া হল! বললেন কিছু খেয়েছ? আমি গাঁইগুঁই করতে লাগলাম! কি খাব স্যর? এত সকালে খাওয়া যায়? যেতে আসতে পুরো তিন ঘন্টা!
স্যরের গলাটা হঠাৎ কিরকম যেন গম্ভীর হয়ে গেল! বলে উঠলেন- পেটের জ্বালা বড় দায় অরিন্দম! মনের সুকুমার বৃত্তি গুলোকেও শেষ করে দেয় এই জ্বালা! আমি একটু অবাক হয়ে মানুষ টাকে ভাল করে দেখতে চেষ্টা করলাম! স্যরের গম্ভীর মুখটা থেকে একটা একটা করে খোলস খসে পড়ছে মনে হল! জিজ্ঞেস করলাম স্যর কি হয়েছে আপনার! কোন ভাবান্তর দেখা গেল না স্যরের মধ্যে! স্যর তখন কি এক ঘোরের মধ্যে বলে চলেছেন - জানো অরিন্দম আমি লোকটা না খুব খারাপ! সারাজীবন না একটা ভাল স্বামী র দায়িত্ব পালন করলাম না একটা আদর্শ পিতার! যুবক বয়সে মেসে থাকতাম কয়েক জন মিলে! সেখানে থেকেই পরীক্ষার পড়াশোনা করতাম! সকালে টিউশনি আর রাতে কলেজ থেকে ফিরে বুক বাইন্ডিং এর কাজ করতাম! মাঝে পড়াশোনা টা ঠিক রেখেছিলাম! একসময় হেডমাস্টার নিযুক্ত হয়ে যখন এলাম এই স্কুলে দেখলাম অনেকের অনেক সমস্যা! সবার সমস্যা মেটানো তোমার পক্ষে সম্ভব নয়! আবার সবাইকে খুশি করাও যাবেনা! সারাদিন এই স্কুল বাড়িটা আগলে পড়ে থাকতাম! এ আমার কাছে সন্তানের মতন! বাড়িতে সময় দিতে পারতাম না! কত রাত বাড়ি যাই নি! স্কুলে রাত জেগে কাজ করেছি! কি পেলাম জীবনে? বউটাও বুঝলনা! ছেলেকে নিয়ে আলাদা থাকতে শুরু করল! প্রথম প্রথম যোগাযোগ ও করতে দিতনা! একদিন ছেলে সামনে দাঁড়িয়ে শুনিয়ে দিল আমি নাকি তার বাপই না! অরিন্দম তোমরা যখন আমাকে অভিযোগ কর তখন আমার বুক ফেটে কান্না আসে জান? কিন্তু ওই চেয়ারে বসে কাঁদতে নেই! পেশাদারিত্ব আমার জীবনে পুরো অভিশাপ হয়ে গিয়েছে! যত সৎ থাকতে চেয়েছি তত লোকের চোখে বিদ্ধ হয়েছি! হেডমাশটার হেব্বি হারামি এই কথা শুনতে শুনতে কান আমার পচে গেছে! এখন আর ওসব কিছু মনে হয় না! পরের বছর আমি রিটায়ার করে যাব! কিন্তু বিশ্বাস কর এই জায়গাতে আমি আমৃত্যু থাকতে চাই! এই জায়গা আমার বড় নিজের!
আমি সম্মোহিতের মত কথা গুলো শুনছিলাম! রাগী মানুষটার আজ সম্পূর্ণ অন্যরূপ দেখলাম আমি! পেশার কাঠামোতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা মানবজীবন বড় অসহায়! দেখলাম স্যরের চোখের কোণে জল চিক চিক করছে! মুহুর্তের জন্য নিজের পেশাগত অবস্থান ভুলে গেলাম! আস্তে করে স্যরের চেয়ারের সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে বললাম স্যর আপনি কিছু খেয়েছেন সকাল থেকে? চলুন দুজনে মিলে খিচুড়ি বসাই! ডিম তো আছে! দুই বেলা হয়ে যাবে দু জনার! কি বলেন স্যর? হেড মাষ্টার অবাক চোখে তাকালেন আমার দিকে! আমি বলে উঠলাম না স্যর আজ ভাবছি বাড়ি ফিরব না! রাতে থেকে যাব আপনার কাছে! এত কাজ আপনি একা সামলান আর আমি পারবনা! তখন আঁধার ঘনিয়ে এসেছে! স্কুল পাগল মানুষটার মুখ ভাল করে দেখতে পারলাম না! শুধু অনুভব করলাম আমার বাম কাঁধে সম্মতির একটি উষ্ণ স্পর্শ! পুকুরের দিকে কনকচাঁপা গাছটির সৌরভে গোটা স্কুল বাড়ি মম করছে তখন....!!!
অরিন্দম © নবপল্লী
বিঃদ্রঃ এই গল্পের সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক, বাস্তবের সাথে কোন যোগাযোগ থাকলে তা নেহাত কাকতালীয়.........।।
বিঃদ্রঃ এই গল্পের সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক, বাস্তবের সাথে কোন যোগাযোগ থাকলে তা নেহাত কাকতালীয়.........।।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন