স্মৃতি শক্তি


স্মৃতি শক্তি
মনোবিদ  সৌমেন মণ্ডল
Mob. 7685937410

স্মৃতি শক্তি নিয়ে তাত্ত্বিক গন পূর্বে বহু আলোচনা করে গেছেন। তাই এখানে আমি কোন তাত্ত্বিক আলোচনা না করে বর্তমানে আমরা ও আমাদের সন্তানরা স্মৃতি শক্তি জনিত যে ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি সেই সমস্যা গুলি ও সেখান থেকে কিভাবে বেরিয়ে আসা যেতে পারে তার ওপর আলোক পাত করার চেষ্টা করব

আমি অনেক বাবা মা কেই একটা অভিযোগ করতে শুনি যে; “আমার সন্তান পড়াশোনায় ভীষণ অমনোযোগী এবং কিচ্ছু মনে রাখতে পারেনা” অর্থাৎ স্মৃতি শক্তির সমস্যা আছে এবং এটা নিয়ে বাবা মা বেশ চিন্তিত। এটা শুধু ছোট দের সমস্যা তা কিন্তু নয়; বড় রাও এমন সমস্যায় ভোগে এরকম অনেক উদাহরণ  আছে।
এখন প্রশ্ন হলো সত্যিই কি এটা সমস্যা ?? তাহলে এর থেকে বেরিয়ে আসার কি কোন উপায় নেই?? যদি সত্যিই কারো স্মৃতি শক্তি কম থাকে তাহলে কি স্মৃতি শক্তি বাড়ানো র কি উপায় আছে??

কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটা সত্যিই সমস্যার; তবে এই সমস্ত সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসাও সম্ভব এবং তার উপায় আছে
খুব সাধারন ভাবে আমরা স্মৃতি বলতে বুঝি পূর্বে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা যা সবসময় আমাদের মনের মধ্যে জীবন্ত; আমরা চাইলেই তার সাথে সময় কাটাতে পারি; কথা বলতে পারি।
আমাদের বোঝার সুবিধার জন্য সময়ের আঙ্গিকে আমরা স্মৃতিকে দু ভাগে ভাগ করে নিতে পারি ।
 () স্বল্পস্থায়ী স্মৃতিশক্তি ও
() দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিশক্তি।

মজার ব্যাপার হলো এই দু টি স্মৃতি পরীক্ষা করে দেখে নেওয়া যায় কার স্মৃতির পরিমান কত। অর্থাৎ আমরা পরীক্ষা করে জেনে নিতে পারি আমাদের স্মৃতি সত্যিই দুর্বল কিনা। যদি দুর্বল হয় তাহলে আমরা তার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি । আর যদি তা না হয় অথচ মনে হচ্ছে ‘আমি সব ভুলে যাচ্ছি’ তাহলে এটা অন্য কোন সমস্যা হতে পারে।

স্বল্পস্থায়ী স্মৃতিশক্তি বলতে বোঝায় মস্তিস্কে যে স্মৃতি গুলো স্বল্প সময়ের জন্য স্থায়ী হয়; আর দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিশক্তি বলতে বোঝায় বহু পুরানো স্মৃতি  মনের মধ্যে কতটা জীবিত; অর্থাৎ দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি।

এবার দেখে নেওয়া যাক কি কি কারনে এই স্মৃতির শক্তির সমস্যা হতে পারে –
আমাদের মস্তিষ্ক কখনও কম্পিউটার আবার কখনও নয়; অর্থাৎ আমাদের  মস্তিষ্কে কখনও কিছু প্রোগ্রাম এক সাথে চলতে পারে আবার কিছু প্রোগ্রাম এক সাথে চলতে পারেনা; যেমন- আমরা গান শুনতে শুনতে অঙ্ক করতে পারি। অন্যদিকে খেলার মাঠের কথা চিন্তা করতে করতে পড়তে পারিনা আমাদের কিছু অভ্যাস আমাদের অমনোযোগী করে তোলে অর্থাৎ এই অমনযোগীতাই স্মৃতি শক্তি বৃদ্ধির পথে সব থেকে বড় অন্তরায়। আর এই ব্যাপারে যদি আমরা সচেতন হতে পারি তাহলে আমরা আমাদের মস্তিষ্কের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সক্ষম হবো।  

১) আনন্দ ও প্রস্তুতি পর্ব -  
আমরা যে সমস্ত ঘটনা গুলির জন্য আনন্দের সহিত আগাম প্রস্তুতি নিই তা সহজে ভুলে যাই না। যেমন আমাদের হয়ত সকলেরই মনে আছে স্কুলে প্রথম প্রেমিকাকে লেখা চিঠির ঘটনা অথবা ছোট বেলায় দল বেঁধে বন্ধুদের সাথে আম বা লিচু চুরির ঘটনা; কারণ এই সমস্ত ঘটনা গুলির জন্য আমরা আগে থেকে প্রস্তুত; আনন্দিত ও উত্তেজিত ছিলাম।
যে সমস্ত ছাত্র-ছাত্রি রা পড়া মনে না থাকার সমস্যায় ভোগে তাদের অনেক কেই দেখেছি পড়তে বসার আগে তাদের কোন মানসিক প্রস্তুতি থাকেনা;  বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এরা আগ্রহ; উৎসাহ ; নতুন কিছু শেখার ইচ্ছে হারিয়ে ফেলে বা ইচ্ছা তৈরীই হয় না; ফলে যা কিছু পড়ে তার বেশির ভাগই স্মৃতিতে থাকেনা।

২) মনস্তাত্ত্বিক অপূর্ণতা-
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় আমাদের মানসিক পূর্ণতার অভাব অর্থাৎ আমাদের  মনের স্বাভাবিক ইচ্ছে গুলি যখন পূর্ণতা পায়না বা দমিয়ে রাখা হয় তখন সেই অপূর্ণ ইচ্ছে গুলি আমাদের মস্তিষ্ক কে শান্ত থাকতে দেয়না; শয়নে স্বপনে বার বার আসতে থাকে ফলে অন্য দরকারী বিষয় গুলিতে আমরা মনোনিবেশ করতে পারিনা এবং কেউ কিছু বললে আমরা তা ভুলে যাই।
কখনও কখনও এই অপূর্ণ চিন্তা গুলি নিজের মানসিক তৃপ্তির জন্য মনের মধ্যেই একটা জগত তৈরী করে ওই অপূর্ণ কাজ গুলি করতে থাকে; ফলে আপাত দৃষ্টিতে কাজ করতে দেখা গেলেও আসলে সে অন্য কাজে ব্যাস্ত থাকে তাই এই সময়ের মধ্যে বাস্তবের মাটিতে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনা মনে থাকার কোন প্রশ্নই থাকেনা।
এবিষয়ে ছাত্র-ছাত্রীর ক্ষেত্রে খেলা-ধূলা একটা বড় উদাহরণ হতে পারে। বাস্তবে হয়ত দেখা যাবে সে শিক্ষকের কাছে পাঠ নিচ্ছে কিন্তু তার মনন জগতে সে  হয়ত তখন খেলার মাঠে বল করতে ব্যাস্ত।

৩) দুশ্চিন্তা-
বর্তমান সময়ে ছোট থেকে বড় প্রায় সকলেই কম বেশি দুশ্চিন্তায় ভোগে। গভীর দুশ্চিন্তাও এক প্রকার ব্যাধি; এর জন্য চিকিৎসা দরকার। এই দুশ্চিন্তাও মানুষকে অমনোযোগী করে তোলে; ফলে স্মৃতি শক্তির সমস্যা দেখা যায়

৪) অনুশোচনা-
অনেক সময় আমরা নিজেদের ভুলের জন্য নিজেরাই কষ্ট পাই। যতক্ষন এই কষ্ট থাকে ততক্ষন আমরা অন্য কিছুতে মন বসাতে পারিনা সে কারনে ওই সময় ঘটে যাওয়া ঘটনা আমাদের স্মৃতিতে জায়গা করে নিতে পারেনা।

৫) নেতিবাচক কথাবার্তাঃ
বিভিন্ন সময়েই আমাদের নেতিবাচক কথাবার্তার মুখো-মুখি হতে হয়; যেমন- ছোট দের ক্ষেত্রে বাবা-মা; শিক্ষক প্রমুখরা বলে থাকেন ‘তোর দ্বারা কিচ্ছু হবেনা। ছেলেটা একদম পড়াশোনা করে না। ও মা আমার ছেলে ত একটুও পড়াশোনা করেনা রে’।
এই ধরনের নেতিবাচক কথাবার্তা শুধু মন ভেঙ্গে দেয় তাই নয়; শিশু মনের আত্মবিশ্বাস কে ধ্বংস করে দেয়; ফলে স্মৃতিতে থাকলেও সে অনেক কিছু বলার ও লেখার সাহস পায়না।
 এই সমস্ত প্রতিবন্ধকতার দিক গুলি বাদ দিয়ে প্রত্যেক মানুষের একটা স্বাভাবিক স্মৃতি শক্তি পাওয়া যায় এবং কিছু নিদিষ্ট অভ্যাসের মধ্য দিয়ে সেই স্মৃতি শক্তির বৃদ্ধিও ঘটানো যায়।

স্মৃতি শক্তি বৃদ্ধি ঘটানোর জন্য দরকার-

১) পর্যাপ্ত ঘুম-
স্মৃতি শক্তি বৃদ্ধি ঘটানোর জন্য পর্যাপ্ত ঘুম ভীষণ ভাবে প্রয়োজন ; কারণ আমরা যখন ঘুমোই তখন আমাদের মস্তিষ্ক পুরোপুরি  ঘুমোয়না তখন তার অনেক কাজ থাকে। আমাদের সারাদিনের ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলিকে ওই সময় গুছিয়ে রাখে। যদি পর্যাপ্ত ঘুম না হয় তবে সারাদিনের ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলি এলোমেলো হয়ে হারিয়ে যেতে পারে।

২) মস্তিষ্কের ব্যায়াম –
নিয়মিত মস্তিষ্কের ব্যায়াম মস্তিষ্ক কে শক্তিশালি করে। আমরা বিভিন্ন পাজেল গেম ও খবরের কাগজের শব্দ-জব্দ খেলার সাহায্যে এর অভ্যাস করতে পারি।

৩) মনে রাখার ধরন –
সমস্ত মানুষের মনে রাখার ধরন এক রকম নয়; ভিন্ন ভিন্ন রকমের। তাই বুঝতে হবে কে কিভাবে ভালো মনে রাখতে পারে। যেমন- কেউ জোরে জোরে পড়ে ভালো মনে রাখতে পারে; কেউ ছবি দেখে; কেউ শুনে । তার জন্য সেই পদ্ধতি ব্যাবহার করাই ভালো।

৪) সময়ের গুরুত্ব –
ঘুমোতে যাওয়ার আগে ও ঘুম থেকে ওঠার পরের সময় টা ভীষণ গুরুত্ব পূর্ণ; তাই জটিল বা রিভাইজ দেবার মতো বিষয় গুলো আমরা এই সময় করতে পারি।

৫) একঘেয়েমিতার অবসান -
  একই রকম রুটিন দীর্ঘদিন চলতে থাকলে একঘেয়েমিতা তৈরি হতে পারে; তাই মাঝে মধ্যে রুটিনের বাইরে বেরিয়ে রিফ্রেশমেন্ট দরকার।

৬) খাদ্য তালিকা –
মস্তিষ্কের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এন্টি-অক্সিডেন্ট ও প্রচুর ভিটামিন জাতিও খাবারের প্রয়োজন। যেমন-  
শাক শব্জি- বাঁধা কপি; পালং শাক; বিট-গাজর; প্রভৃতি। এতে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন আছে যা মেধা শক্তি বৃদ্ধিতে কাজে লাগে।
সামুদ্রিক মাছ – সামুদ্রিক মাছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড থাকে যা মস্তিষ্কের জন্য ভীষণ উপকারি।  

ফল; বাদাম –
স্ট্রবেরি; আঙ্গুর; জাম; বাদাম প্রভৃতি খাদ্যের মধ্যে আছে এন্টি-অক্সিডেন্ট যা ব্রেনের কোষের ক্ষয় রোধ করে ও মস্তিষ্কের কার্য ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। 
***






 



          

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ডাকটিকিট বা স্টাম্প

ডাকটিকিট বা  স্টাম্প                                                        পৃথিবীতে প্রথম কি ভাবে প্রচলন হলো আর কেমন ছিলো  *********...